Saturday, May 29, 2021

গ্লোবট্রটার



সদর দরজাটা খুলেই থ হয়ে গেলেন লালুবাবু। 

- আসতে পারি?
- আ...আস...আসবেন? 
- আপনার আমতা আমতা ভাব দেখে আমি কিন্তু নিশ্চিত যে আপনি আমায় চিনতে পেরেছেন। 
- ম....ম...মানে...। 
- অবিশ্যি যোধপুর সার্কিট হাউসের স্মৃতি অত সহজে ফিকে হয়ে যাওয়ার কথাও নয়।
- আ...আ...আমি কিন্তু পু...পুলি...। 
- পুলিশকে আমিই খবর দিয়েছি। ওই আপনার বাড়ির সামনেই যে ফার্মেসিটা, তাঁরা কল করতে দিলে। আপনার ঠিকানাই দিয়েছি। ওরা এখান থেকে আমায় পিক করে নিয়ে যাবেন।
- আপনার মতলবটা কী বলুন তো মশাই? এ কী! আপনি নিজে থেকেই ঢুকে পড়লেন দেখি।
- আপনার এই আর্মচেয়ারটা বেশ কমফর্টেবল। 
- আমি কিন্তু...!
- চায়ের কথা ভেবে ব্যস্ত হবে না কিন্তু। যে কোনও জায়গার চা আমার জিভে ঠিক রোচে না। ও ব্যাপারটা কিন্তু আমি সে'বার বানিয়ে বলিনি। আর তাছাড়া হাতে সময় কম, জরুরী আলোচনাটা আগে সেরে ফেলি। আফটার অল, হাতে সময় বেশি নেই। 
- আপনি কিন্তু রীতমত ট্রেসপাস করেছেন। ফেলুবাবুকে একটা কল করলেই...। 
- ওঁর তো এখন শুনছি টিকটিকিগিরি করে বেশ ভালোই নামডাক হয়েছে। যাক, মাই বেস্ট উইশেস। তবে আপনার অত নার্ভাস হওয়ার কিছু হয়নি মিস্টার গাঙ্গুলি। আমি শুধু আপনাকে একটা জরুরী আপডেট দিতে এসেছি। আর বললাম তো, পুলিশ তো এলো বলে। চাইলে আমার ব্যাগটা চেক করে নিতে পারেন, এতে ছুরি, কুকরি, পিস্তল বা বিছে; কোনোটাই নেই।
- যা বলার ক্যুইকলি বলে ফেলুন। 
- আহ, অত অধৈর্য হলে চলবে কেন? বসুন। 
- না মানে...। 
- বসুন!
- হুঁ? হুঁ!
- শুনুন, আমি এখন একজন চেঞ্জড ম্যান। আর ফেলুবাবুর ওপর ওই বিশ্রী অ্যাটেম্পটগুলোর জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। তবে পেটের দায়ে মানুষ কী না করে।
- আপনি কি এইটা বলার জন্য বাড়ি বয়ে এলেন? 
- না না, একটা বড় খবর আছে। 
- আমি তো ভেবেছিলাম আপনি এখনও জেলে রয়েছেন।
- ভবানন্দ এখনও জেলে। আমি পাঁচ বছরের মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে পেরেছিলাম।
- যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন মন্দারবাবু।
- জানেন মিস্টার গাঙ্গুলি, ভবানন্দের পাল্লায় পড়ে কম ভেক ধরতে হয়নি। বাবাজির চ্যালা, ফিজিসিস্ট, বিজনেস টাইকুন; কী না হয়েছি। আর ফোরটুয়েন্টি বিজনেসে থেকেও এই অভিনয়গুলোকে আমি চিরকালই সিরিয়াসলি নিয়েছি। প্রত্যেকবার রীতিমত রিসার্চ করে নিজেকে তৈরি করতে চেয়েছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উতরেও গেছি; যাকে বলে উইথ ফ্লাইং কালার্স! ইনফ্যাক্ট আমার ভেক ওয়াজ আ মেজর অ্যাসেট ফর ভবানন্দর ভোজবাজির ব্যবসা। 
- এই গল্পগুলো কি আমায় শোনাতেই হবে মন্দারবাবু?
- এ'কারণেই তো মাদ্রাজ থেকে এদ্দূর ছুটে এলাম...।
- মাদ্রাজ থেকে কলকাতা এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে?
- নাথিং বাট দ্য ট্রুথ মাই লর্ড! অবিশ্যি দিন পনেরো আগেই এসে পৌঁছেছি। যাকগে...যে'টা বলছিলাম। ভেক তো কম ধরিনি। তবে সে'বার রাজস্থানে এমন একটা ব্লান্ডার করে বসেছিলাম...যে তার জন্য বহু বছর হাত কামড়ে কেটেছে। না না, ফেলুবাবুর হাতে পরাস্ত হয়েছিলাম বলে নয়। গ্লোবট্রটারের ভূমিকায় অভিনয় করার সাধটা কিন্তু আমার বহুদিনের ছিল বুঝলেন। তার জন্য বহুদিন ধরে প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। সে'বার যোধপুরে দিব্যি সুযোগও পেয়ে গেলাম। অথচ...।
- রুমালের মায়ের নাম জেনে যে আমার কী বেনেফিট হচ্ছে সে'টা আমি এখনও ঠাহর করতে পারছি না মশাই। 
- পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়েই তো আদত গল্পে পৌঁছতে হবে মিস্টার গাঙ্গুলি। 
- ব...বেশ।
- তা যে'টা বলছিলাম। অমন একটা ফার্স্টক্লাস সুযোগ পেয়েও যে এমন ব্লান্ডার করে বসব সে'টা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
- ব্লান্ডার?
- ওই যে, ফস করে বলে ফেললাম; টাঙ্গানিয়াকায় নেকড়ে শিকার করেছি। কেনিয়ার হাতির ব্যবসার ওপর অত রিসার্চ করার পরেও কেন যে খামোখা আফ্রিকায় নেকড়ের মত একটা লুজ ক্যানন মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল। সে অনুতাপে আমি বহু বছর দগ্ধ হয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে গ্লোবট্রটারের অভিনয় করতে হলে আমাকে আরও রিলিজিয়াসলি প্রিপেয়ার করতে হবে। কাজেই এ ব্যাপারে আমি আপনার কাছে সবিশেষ গ্রেটফুল।
- ইয়ে, কী যে বলব। ইউ আর ওয়েলকাম।
- জেলে বসেই আমি মনস্থ করেছিলাম বুঝলেন, একটা ফার্স্টক্লাস গ্লোবট্রটারের ভূমিকায় নিখুঁত অভিনয় না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কাজেই জেল থেকে বেরিয়েই শুরু করলাম; প্রস্তুতি। 
- গ্লোবট্রটিং?
- ভূপর্যটন যদি করেই ফেলি, তবে আর ভূপর্যটক হিসেবে অভিনয় করার প্রশ্ন আসছে কী করে মিস্টার গাঙ্গুলি। পর্যটন আমি শুরু করেছিলাম, তবে বইয়ের পাতায়। প্রচুর পড়েছি জানেন। ভূপর্যটকদের জীবনী। ভ্রমণের বই। ইতিহাস। ভূগোল। এমন কী পলিটিকাল সায়েন্স আর সোশ্যিওলজিও বাদ দিইনি। একটা অভিনয়ের জন্য টানা চোদ্দ বছর ধরে আমি শুধু পড়াশোনা করেছি। দিনরাত শুধু একটাই স্বপ্ন আমায় ইন্সপ্যায়ার করে গেছে; একজন ভূপর্যটকের ভূমিকায় আমায় নিখুঁত করতে হবে, করতেই হবে। আমি বুঝেছিলাম মিস্টার গাঙ্গুলি, দু'চারটে বাতেলা আর বোলচাল ছুঁড়ে অল্প সময়ের জন্য ইম্প্রেস করা যায়। কিন্তু একজন ট্র্যাভেলারের চোখ অর্জন করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমি রীতিমত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রস্তুতি নিয়েছি। তবে কী জানেন, পেটের দায় বড় দায়। খালি পেটে পড়াশোনা করা যায় না আর বিনি পয়সার বইও জোটানো যায়না। কাজেই সে দায়ে পড়ে কিছু কুকর্ম করতেই হয়েছে। মিথ্যে বলব না, পড়াশোনার ফাঁকে এমন একটা বড় দাঁও মেরেছি যে সে আমাউন্ট শুনলে আপনার পিলে চমকে যাবে। হে হে হে...।
- ক্রাইম?
- আনফরচুনেটলি, ইয়েস। তবে সে'টাকা আত্মসাৎ আমি করিনি। সে আশ্বাস দিতে পারি। এক মরণাপন্ন অ্যান্থ্রোপলজিস্টের কিছুদিন সেবার করেছিলাম। হাউ অ্যান্ড হোয়েন, সে'টা বলতে গেলে অন্য উপন্যাস লিখতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে যে'টা হল; ওয়ান ঢিল, টু পাখিস। সে ভদ্রলোক ঘোরের মধ্যে নিজের বিভিন্ন রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা আউড়ে যেতেন, আর আমি নোটস নিতাম। সেবায় ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু ও মারা যাওয়ার পর নেহাত অভ্যাস বসে ওর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সটা আত্মসাৎ করি। সে টাকার খানিকটা খরচ করেই দিব্যি নিজেকে গড়ে পিটে নিয়েছি লালমোহনবাবু। টাঙ্গানিয়াকার নেকড়ে মার্কা বাজে গল্প আর শর্মার মুখ দিয়ে বেরোবে না, এ আপনি নিশ্চিত জানবেন।
- যোধপুরেও বলেছিলাম। বলে ঠকেছিলাম। আজ আবার বলছি। আবার ঠকব কিনা জানি না। আপনার ফের কালটিভেট করার ইচ্ছে জেগেছে মশাই।
- হা হা হা হা! বেশ তো। তা যা বলছিলাম। সে অ্যান্থ্রোপলজিস্ট ভদ্রলোকের টাকাটা পকেটস্থ করে গোটা জীবন লাটসাহেবি করে কাটিয়ে দিতে পারতাম বটে। তবে সিরিয়াস পড়াশোনা বেশ গোলমেলে জিনিস। নিজে কোনওদিন দেশের বাইরে পা না রাখলেও, আমার মনটা ততক্ষণে আকাশের মত খোলতাই হয়ে গেছে। কাজেই আমি ঠিই করলাম যে কুপথে আয় করা টাকাটা যথাস্থানে পৌঁছে দিতেই হবে। সে কারণেই আমার কলকাতায় আসা। ওই ভদ্রলোক ব্যাচেলর ছিলেন। খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম তার এক ভাগ্নি ক্যালকাটায় রয়েছে, অনলি এয়র। ব্যাস, চলে এলাম। আজ ওদের গুডবাই বলে, ওই ভারিক্কি চেকটা ওদের হাতে তুলে দিয়েই সোজা আপনার এখানে চলে এলাম। আর ওই যে বললাম, পুলিশকে জানিয়েই এসেছি। তবে আসল খবর সে'টা নয়। 
- তবে?
- আমি গ্লোবট্রটারের ভূমিকায় অভিনয় করেছি মিস্টার গাঙ্গুলি। াইনালি! উইথ ডিসটিঙ্কশন।
- কী রকম?
- এই অ্যান্থ্রোপলজিস্ট মনমোহন মিত্র একজন গ্লোবট্রটারও বটে। বছর তিরিশেক দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন। ফ্যাসিনেটিং পার্সোনালিটি, বুঝলেন। নিয়মিত ডায়েরি লিখেছেন, সে'সব পড়ে তো আমি যাকে বলে সোয়েপ্ট অফ মাই ফীট। প্রথমে ভেবেছিলাম ওর টাকার চেক কেটে সোজা ওর পরিবারের হাতে তুলে দেব আর পুলিশের কাছে সারেন্ডার করব। কিন্তু তারপর মাথায় স্ট্রাইক করল সেই ইউরেকা আইডিয়া!
- কী রকম?
- মনমোহন মিত্রের ভাগ্নি অনিলা। সে নিজের হাসব্যান্ড সুধীন্দ্র বোসের সঙ্গে কলকাতাতেই থাকে। নিজের মামাকে অনিলা খুকি বয়সের পর আর দেখেনি। ঘর পালানো মনমোহনের খবর পরিবারের কেউই রাখেননি বহু বছর। ব্যাস, সেই সুযোগটাই আমি নিলাম। সে বেঁচেবর্তে আছে কিনা সে সম্বন্ধেই তাঁরা ওয়াকিবহাল নয়, তাঁর কর্মকাণ্ডের খবর অবভিয়াসলি তাদের কাছে পৌঁছয়নি।  যাক, অনিলাদের বাড়িতে সে'খানে পৌঁছে নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করলাম অ্যাজ মনমোহন মিত্তির। বিশ্বাস করুন, সে এক্কেবারে হপ্তাখানেকের অগ্নিপরীক্ষা! অনিলা সুধীন্দ্র দু'জনেই সন্দিহান, বিভিন্নভাবে আমায় বাজিয়ে দেখছে তাঁরা। এমন কী তাদের কিছু বন্ধুবান্ধবও এসে চা-বিস্কুটের আড়াল থেকে কত রকমের ইনভেস্টিগেটিভ প্রশ্ন ফায়্যার করেছে। দিনের পর দিন । সত্যি কথা বলতে কি এক সময় আমার মনে হয়েছিল বোধ হয় ধরা পড়ে গেছি। ক'দিনের জন্য গা ঢাকাও দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়েছে। তারা আমায় গদগদ ভাবে নিজের মামা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে, প্রবল যত্নআত্তিও  করেছে। আজ সকালে তাদের থেকে বিদেয় নিয়ে এলাম, ধরিয়ে এলাম সেই চেক।
- বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে এবার আপনাকে। তবে ঘরপোড়া গরু তাই...। 
- আই ডোন্ট ব্লেম ইউ। তবে পুলিশ এসে পড়লেই সমস্ত ক্লীয়ার হয়ে যাবে। কী জানেন মিস্টার গাঙ্গুলি, মনমোহন মিত্তির আর মন্দার বোসে তেমন ফারাক নেই। দু'জনের মুখ দিয়েই একই রকম ডায়লগ ডেলিভার করেছি, দু'জনের হয়েই বলেছি যে নিজের মাতৃভাষা কেউ ভুলতে না চাইলে তিরিশ বছরেও ভোলে না আবার ভুলতে চাইলে তিন মাসই যথেষ্ট। অথচ মনমোহনের বলা কথাগুলো যেখানে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, মন্দার বোসের কথাগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে হাড়-জ্বালানো বাতেলা। 
- মন্দার বোস প্লাস জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ইজ ইকুয়াল টু মনমোহন মিত্তির, তাই নয় কী? 
- হেহ! সে'বার আপনার কাছে নেকড়ে নিয়ে পর্যুদস্ত হলাম। অথচ এবারে কত বাঘা বাঘা জেরার সামনে পড়েও পালটা ল্যাজে খেলিয়ে ছেড়েছি। আপনি সে'বার ইন্সপ্যায়ার করেছিলেন বলেই এ'সব সম্ভব হয়েছে লালমোহনবাবু। আর সে জন্যই, অ্যাস আ টোকেন অফ মাই অ্যাপ্রিশিয়েশন, আপনার জন্য ছোট্ট একটা উপহার নিয়ে এসেছি।
- এ'টা কী...বই? আহ এ'সবের আবার কী দরকার ছিল...।
- লেফটানেন্ট সুরেশ বিশ্বাসের জীবনী, বইটি সহজলভ্য নয়। সুরেশ বিশ্বাসের মত মানুষও অবশ্য সহজলভ্য নয়। আপনার ভাষা ধার করে বলি; হাইলি পাওয়ারফুল ভূপর্যটক! ওই, ওই কলিংবেল বাজছে। পুলিশ বোধ হয়...। 
- এহ, গল্পটা সবে জমে উঠেছিল মন্দারবাবু!
- সাম আদার টাইম দেন। দরজাটা খুলে দিন।
- ইয়ে আপনার আদত নামটা...। 
- আপাতত মন্দার বোসই থাক।  

No comments: