Friday, April 3, 2020

সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং


- মিস্টার চৌধুরী...হ্যালো...মিস্টার চৌধুরী...ক্যান ইউ হিয়ার মি? মিস্টার চৌধুরী...হ্যালো...হ্যালো..।

- হ্যালো..অভিষেক নাকি...।

- যাক...আধঘণ্টা ধরে হাঁকডাক করেও আপনার সাড়া না পেয়ে খুব নার্ভাস হয়ে গেছিলাম...।

- আমার এদিকের স্ক্রিনটা হ্যাং করে গেছিল। তার বেশি কিছু নয়...। তা তুমি কী ভাবলে..বুড়ো অক্কা পেয়েছে বোধ হয়..তাই না?

- ছি ছি, ও কথা মুখে আনবেন না প্লীজ।

- মুখে না আনলে কি ভবিতব্য আটকে থাকবে হে? মেঘে মেঘে বেলা তো কম হল না৷ সামনের শনিবার একশো দুইয়ে পড়ব। আর কদ্দিন বলো।

- বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রনেতারা আপনার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন, এ তো আপনার অজানা নয় মিস্টার চৌধুরী। আধুনিক মেডিকাল সায়েন্স দুনিয়া ওলটপালট করে দিচ্ছে আপনার জন্য...।

- তোমার রাষ্ট্রনেতাদের বোলো যে আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ কিন্তু বয়সের ভারে এ'ভাবে ন্যুব্জ হয়ে একাকী আর দিন কাটেনা। আমার এ'বার মুক্তির প্রয়োজন হে।

- এমন বলছেন কেন মিস্টার চৌধুরী...গোটা পৃথিবী জুড়ে আপনার যে সমাদর...দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ আপনাকে এত ভালোবাসে...। আপনি তো আমাদের কাছে ঈশ্বরতুল্য।

- কিন্তু এই বন্দীদশা যে আর সহ্য হয় না অভিষেক।  এত খ্যাতি, এত ভালোবাসা; সবই আজকাল যন্ত্রণার মত ঠেকে। প্রাইমমিনিস্টারকে বলো এ'বার আমার মুক্তির প্রয়োজন। 

- অমন করে বলবেন না মিস্টার চৌধুরী। আর আপনি নিজেকে বন্দী বলে কেন ভাবছেন..স্রেফ সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বই তো নয়। 

- বাহাত্তর বছরের সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং..এর চেয়ে জেলে পচলে যন্ত্রণা কম হত হে।

- আপনার সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বাহাত্তর বছর হতে চলল? সেভেনটি ট্যু? ভাবলেই কেমন..।

- গায়ে কাঁটা দেয় না গা গুলিয়ে ওঠে?

- সমীহ হয়।

- বাহাত্তর বছর। ভাবলে কেমন আশ্চর্য লাগে যে সেই খুনে ভাইরাস পৃথিবীতে আজ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর কেউ তার থেকে নিজেকে বাঁচাতেও পারলে না...কেউ না। নট আ সিঙ্গল সোল..।

- কিন্তু আপনি পেরেছেন..। গোটা বিশ্বে...মানব।ইতিহাসে একা আপনি।

- কারণ আজ থেকে বাহাত্তর বছর আগে একা আমি এই খুনে ভাইরাস আর তা ঠেকাতে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম।

- সে জন্যেই তো পৃথিবীর সমস্ত স্কুলপাঠ্য ইতিহাসের বইতে আপনি নায়কের  মত জ্বলজ্বল করছেন মিস্টার চৌধুরী। 

- নায়ক। তা বটে। এখন আমায় নিয়ে আদেখলপনা কম দেখি না। অথচ এই আমাকেই এককালে গোটা পৃথিবীর মানুষ মিলে হেনস্থা করেছে। যে ভাইরাসের আক্রমণে জ্বর হয় না, কাশি হয় না, কেউ মারা যায় না; তার সংক্রমণের ভয়ে ইকনমি ডকে তুলে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং..? এ যে উন্মাদের প্রলাপ। এ ভাইরাসে কী আর এমন হয়; স্রেফ সঙ্গীত তৈরির ক্ষমতা চলে যায়। এই অ্যান্টি মিউজিক ভাইরাস কোনও অদ্ভুত তন্ত্রবলে মানুষের সুর তৈরির ক্ষমতা শেষ করে দেয়; এর জন্য ইকোনমি লাটে তোলা? নৈবচ। এই  আজ যারা আমায় মাথায় তুলে নাচছে, তাক্বদের বাপ-ঠাকুর্দার দলই এককালে আমায় দুয়ো দিয়েছে। খ্যাপা মিউজিশিয়ান বলে আমায় নিয়ে মিম বানিয়ে ফেসবুক ভারি করেছে।

- আসলে...সত্যিই যে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই সংক্রমিত হতে পারে আর কেউই যে এ ভাইরাসকে রেসিস্ট করতে পারবে না..তেমনটা বোধ হয় সে সময় কেউই আঁচ করতে পারেনি।

- কারণ সে সময়ের মানুষ ছিল অত্যন্ত বাতেলাবাজ আর কুচুটে। যাক, যা হওয়ার তাই হয়েছে, সে ভাইরাসের আত্মপ্রকাশের দেড়বছরের মাথায় গোটা পৃথিবীতে এমন একটাও মানুষ পড়ে রইল না যে সুর বাঁধতে পারে।

- আর কোনওদিন তেমন মানুষ আসবেও না। এ ভাইরাস এখন প্রতিটি মানুষের দেহে, এ গ্রহের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে। আর আমাদের মুক্তি নেই।

- বেশ হয়েছে। এমন বেপরোয়া জাতের এই হওয়া উচিৎ। নাও, ঠ্যালা বোঝো এ'বারে৷ সাধের ইকোনমি ধুয়ে জল খাও এ'বারে। গান তৈরি করতে না পারাটা যে একটা সোশ্যাল ক্যান্সার, ব্যাটাগুলো এদ্দিনে বুঝেছে। 

- ক্যান্সারই তো। আর সে ক্যান্সারে একমাত্র আশার আলো যে আপনিই। বাহাত্তর বছর হোম আইসোলেশনে থেকে আপনি আজও মানুষকে নিত্যনতুন সুর উপহার দিয়ে চলেছেন৷ আপনি না থাকা মানে..এ দুনিয়া থেকে সুর উবে যাওয়া...।

- ইকোনমি তো ফুলেফেঁপে উঠবে। আমার সুরও যখন থাকবে না তখন লোকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাক্টিভিটি আরও খানিকটা বেড়ে যাবে। তা নিয়েই না হয় নাচানাচি কোরো সবাই মিলে।

- আপনাকে ছাড়া যে পৃথিবীটাই অন্ধকার হয়ে যাবে মিস্টার চৌধুরী।  আপনি নিশ্চয়ই সে'টা চাইবেন না।

- এদ্দিন চাইনি। কিন্তু আজ..।

- আজ? 

- আজ মনে হচ্ছে যাক, সবাই গোল্লায় যাক। কিন্তু মরার আগে আমি একটা দিনের জন্য অন্তত এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভিড়ে মিশে যাই৷  মিষ্টির দোকানের ভিড় ঠেলে গিয়ে দু'টো কচুরি চেয়ে খাই বা মাছের বাজারে হুড়মুড়ে কোয়ালিটি ট্যাংরা খুঁজে বের করি। বাজারের হট্টগোল, ভরা স্টেডিয়ামের হইহই; মরার আগে এ'সব একবার স্পর্শ না করলেই নয় হে অভিষেক। পিএমকে বলো...আমার মুক্তি চাই। 

- তার তো উপায় নেই মিস্টার চৌধুরী। 

- তোমাদের ছেলেপিলেদের ইস্কুলের বইয়ের অবিসংবাদিত নায়ক আমি, আমারও ইচ্ছামুক্তি নেই?

- আপনার বাড়িটা হচ্ছে ওয়ার্লডস মোস্ট প্রটেক্টেড প্লেস মিস্টার চৌধুরী।  একমাত্র প্রটেক্টিভ স্যুট পরা মেডিকাল টীম ছাড়া কারুর ক্ষমতা নেই ও বাড়িতে ঢোকে। আর আপনারও ক্ষমতা নেই বাড়ি ছাড়ার। অ্যান্টিমিউজিক-ভাইরাস মুক্ত শেষ মানুষ হিসেবে, সে অধিকার আপনি খুইয়েছেন। সরি।

- কীসের সমীহ অভিষেক। আমার প্রতি তোমাদের কীসের ভালোবাসা। 

- সে যাকগে। মিস্টার চৌধুরী, যে কথা বলার জন্য আপনার সঙ্গে কনেক্ট করেছি৷ আমাদের প্রাইমমিনিস্টার আগামীকাল নতুন ক্যাম্পেন লঞ্চ করছেন, সামনেই ভোট কিনা। একটা থীমসং লেখা হয়ে গেছে, উনি নিজেই লিখেছেন। আপনাকে এ'বার সুরটা করে দিতে হবে। চটপট চাই কিন্তু। কেমন?  

(ছবি সূত্রঃ Independent)

1 comment:

Unknown said...

খুব ভালো । কিন্তুু পলিটিক্যালি baised , অবশ্য না হলেও ব্যাপারটা কেমন আলুনি হয়ে যায়। যেন নুন ছাড়া ।

দ্য গ্র‍্যান্ড তুকতাক

- কী চাই? - হুঁ? - কী চাই? চাকরীতে টপাটপ প্রমোশন বাগানোর মাদুলি? শুগার কন্ট্রোলে রাখার তাবিজ? হাড়বজ্জাত মানুষজনের বদনজর এড়িয়ে চল...