Tuesday, August 16, 2016

জিমনাস্টিকের কবলে

সে'বার। বলা নেই কওয়া নেই।

১৯৮৩র অলিম্পিকে দীপা১, দীপা২, দীপা৩, দীপা৪, দীপা৫, দীপা৬, দীপা৭, দীপা৮, দীপা৯, দীপা১০ আর দীপা১১ চমকে দিয়ে জিমনাস্টিকে সমস্ত মেডেলগুলো জিতে নিলেন। এর আগে দু'একটা টুকরোটাকরা জিমন্যাস্টিকস মেডেল যে এ দেশে আসেনি তা নয়, কিন্তু অলিম্পিকের সমস্ত মেডেল এক সাথে?

ব্যাস। গোটা দেশ হুমড়ি খেয়ে পড়লে জিমন্যাস্টিক্সে। খোকার ঘরের দেওয়ালে দীপা১য়ের পোস্টার, বিজ্ঞাপনে দীপা২, খবরের কাগজ আলো করে দীপা৩ ইত্যাদি।পাড়ায় পাড়ায় দীপাদের সংবর্ধনা। এর ওপরে জুটলো এসে বিসিজিআই, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর জিমনাস্টিকস ইন ইন্ডিয়া। তারা করলে কী একটা মজবুত ব্যবসা ফেঁদে বসলে। ব্যবসা ফাঁদলে যা হয়, জিমন্যাস্টদের পকেটে টু পাইস এলো, তাদের রোয়াব বাড়লো। আর সস্তা পয়সায় কী না হয়? মানি বিগেটস মোর মানি অ্যান্ড সাকসেস। পয়সার জোরে, ব্যবসার জোরে জিমন্যাস্টিক্সে আরও সাফল্য আসতে লাগলো।

ফলত, তেলা মাথায় তেল। জিমনাস্টিকে টপাটপ মেডেল আর শিরোপা। নজর দিচ্ছি ভাববেন না ভাইটি, জিমনাস্টিকে পয়সা থাকুক, বিজ্ঞাপন থাকুন, সাফল্য থাকুক, কিন্তু সে সাফল্যের ট্যাক্স হিসেবে যে বাকি খেলাগুলো ধুয়ে মুছে যেতে বসেছে।

আমরা খুব সহজে নাম ভুলে যাই।  খুব সহজে। দুরন্ত মারাঠা শচীন তেন্ডুলকারকে মনে আছে? সেই যে সে'বার ২০০০য়ের বিশ্বকাপে টিমকে প্রায় একটা ম্যাচ জিতিয়ে ফেলছিল ছেলেটা। প্রায়। প্রায় জিতে ফেলেছিল আর কী! মনে রেখেছেন তার স্ট্রাগেলের কথা? কী খাটাখাটনি করে ছেলেটা কত অল্প বয়স থেকে ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিল। না।

আপনারা মনে রাখেননি। কারণ আপনাদের মন জুড়ে জিমন্যাস্টিক প্রিমিয়ার লিগের রোশনাই। হিংসে করছি না জিমনাস্টিককে। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি।

জিমনাস্টিক বজ্জাতি করে স্রেফ সাফল্য আর ব্যবসা দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে আপনাকে আমাকে সবাইকে। অথচ ভিভিএস লক্ষণের যুদ্ধটা কেউ বোঝে না। কেউ না। হতে পারে তার তেমন কোনও সাফল্য আসেনি, কিন্তু তাই বলে তার স্ট্রাগলটা মিথ্যে হয়ে যাবে? সেই যে'বার তার বদান্যতায় ভারত পাপুয়ানিউগিনিকে হারিয়েছিল, সে'টা আজ আমরা কী সহজে ভুলে গেছি! আমরা মনে রাখিনি যে ক্রিকেটের স্বল্প সাফল্য ইজ নট বিকজ অফ আওয়ার সাপোর্ট বাট ডেস্পাইট আওয়ার অ্যাপাথি। কী ইনফ্রাস্ট্রাকচার দিয়েছি আমরা লক্ষণ শচীনদের? শুধু জিত দিয়ে ওদের বিচার করা যায়?

জিত। এই জিতের নেশায় আমাদের বুঁদ করে রেখেছে সর্বনাশা জিমন্যাস্টিকস। চার বছরে একবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ এলে আমাদের শচীন প্রেম উথলে উঠবে আর বাকি সময়টা দীপাই আমাদের ভগবান। বছরের অন্য সময়টা শচীন মুখে রক্ত উঠে মারা গেলেও আমাদের কিছু এসে যাবে না কারণ ভারত আগামী ক্রিকেট বিশ্বকাপের মূলপর্বের জন্য কোয়ালিফাই করতে পারেনি।  খেলাটাকে আমরা চিরকাল হারজিতেই দেখে আসব, স্ট্রাগলটুকুর রোম্যান্স বুঝবো না কোনওদিন।

শচীনরা বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং রাউন্ডে হেরেছে কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়াই করে। আমার কাছে শচীন একজন চ্যাম্পিয়ন,  সে বিশ্বকাপ খেলতে পারুক বা নাই পারুক।
দীপা শুধু মাত্র একদল ব্যবসাদারের ঘুঁটি, যার খাতায় সাফল্য হলো একমাত্র অস্ত্র; রোম্যান্সের যেখানে কোনও জায়গা নেই।

এ পোড়া দেশে ক্রিকেট নিজের দোষে মারা যাচ্ছে না, মারা যাচ্ছে টপাটপ জিমন্যাস্টিকস মেডেলগুলোর জন্য। মেডেলই সব নয়, জিতটুকুই শেষ কথা নয়। দীপার ভগবান হয়ে থাকাটাই শেষ কথা নয়।

শচীন না জিতুন, উনি প্যাডেল স্যুইপে বিশ্বের মন জয় করেছেন। ওনার স্ট্রাগল আমরা ভুলবো না। সে'টাই রোম্যান্স, জিমন্যাস্টিক্সের মত সসর্বগ্রাসী ব্যবসা নয়।

জয় হিন্দ।

1 comment:

Anonymous said...

লেখার মাধ্যমে চেতনার উদ্রেক হবে - এ দেশ কি এতই কম পোড়া।

"দ্য লোল্যান্ড" প্রসঙ্গে

যিনি "দ্য লোল্যান্ড" রেকমেন্ড করেছিলেন তিনি এককথায় এ উপন্যাস সম্বন্ধে বলেছিলেন; "বিষাদসিন্ধু"। বিষাদসিন্ধুতে...