বেশিরভাগ বিকেলে ওই কোণের চেয়ারটাতে একা এসে বসবেন মনোহরবাবু। এক কাপ চা নিয়ে মন দেবেন খবরের কাগজে। মনু ছাড়া অন্য কোনো ওয়েটার তাঁর অর্ডার নেবে না। অবশ্য অর্ডার বলতে দু'কাপ চায়ের মাঝে একটা মাখনরুটি। মনোহরবাবুর ভাগ্য ভালো এ রেস্টুরেন্ট বয়স ও জীর্ণতার দিক থেকে প্রায় তাঁরই মত; অতএব এ'খানে তেমন ভিড় হয় না। আর কোণাটা যেহেতু মাত্রাতিরিক্ত ঘিঞ্জি তাই সে টেবিল খালিই থাকে। কালেভদ্রে সে টেবিল খালি না থাকলে মনোহরবাবু পাশের পার্কের বেঞ্চিতে বসে দিনের বাসি কাগজটা পড়ে শেষ করেন।
এখানে চা যে খুব ভালো বানায় তা নয়। কিন্তু অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে মন চায় না। খবরের কাগজেও আজকাল আর খবর কই, শুধুই বিজ্ঞাপন আর রাবিশ। কিন্তু ওই, অভ্যাস ছেড়ে কোথায়ই বা যাবেন। গান শুনতে ভালো লাগে না, টিভি তো দু'চোখের বিষ। অহেতুক অগভীর আড্ডা ব্যাপারটাকে কিছুতেই নিজের অভ্যাসের গণ্ডিতে টেনে আনতে পারেননি মনোহর। অতএব একপ্রকার বন্ধুহীন জীবন, অবশ্য এ'টা তাঁর কাছে স্বস্তির বলে মনে হয়।
মনোহরবাবু অভ্যাসপ্রিয়। আর তাঁর প্রিয়তম অভ্যাস হলো রাণুর কথা ভাবা। রাণুর না থাকাটাও অবশ্য তাঁর অভ্যাসের লিস্টে ঢুকে গিয়েছে। কী আশ্চর্য, আচমকা রাণু ফিরলে কি অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটবে? দ্বিতীয় চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় কাগজটা মুড়িয়ে সরিয়ে রাখেন। তখন এইসব হিজবিজ ভাবনা মনে আসে। মনু রোজ এসে "সত্তর টাকা" বলা মাত্র ভাবনার সুতো কেটে যাবে। সে সুতো কেটে যাওয়াটাও অভ্যাসের ফর্দে ঢুকে গেছে। এ টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারে রাণু বসেছে কয়েকবার, হলুদ আলোয় তাঁকে মনকেমনভাবে সুন্দর লাগতো। "মনকেমনভাবে" কথাটা সম্ভবত বিটকেল বাঙলা, রাণুর অভ্যাস ছিলো এ'টা বলা। রাণু থাকতে কতবার শুধরে দিয়েছেন। রাণু নেই, তাই তাঁর ভুলচুলগুলোকে বড় আপন বোধ হয়, মনকেমনভাবে আপন। হলুদ আলোয় রাণুর না থাকাটায় এই রেস্টুরেন্টের বিকেলগুলো ন্যালাক্যাবলা হয়ে পড়েছে। হঠাৎ যে আজ কী হলো, মনুর "সত্তর টাকা"র উত্তরে পকেট হাত না দিয়ে মনোহর বললেন, "আর এক কাপ চা দিও মনু"।
No comments:
Post a Comment