সিধুবাবুর সাদা মনে কাদা নেই। তাই মেজশালা পিন্টু যখন না বলেকয়ে ভরসন্ধেবেলা তাঁর ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হলে, পত্রপাঠ তিনি মোহনের চপের দোকানে ফোন করে জোড়া ফিশফ্রাইয়ের অর্ডার দিলেন। পিন্টু ছেলেটা এমনিতে ফক্কর। কাজকর্মের বালাই নেই, এমএলের তাঁবেদারি করে আর ফোঁপরদালালি করে দিন গুজরান করে। যা হোক, শ্বশুরবাড়ির লোক যখন তার খাতির করাটা সিধুবাবুর কর্তব্য। সুমি বেঁচে থাকলে অবশ্য মাছভাজা খাওয়ানোর আগে পিন্টুর জামার তিনটে খোলা বোতাম দেখে খানকয়েক গাঁট্টা বসাতো। যা হোক,গাঁট্টা দেওয়ার অধিকার দিদিদের থাকে, কেঠো হাসি দেওয়া ছাড়া অসহায় জামাইবাবুদের কোনো গতি নেই।
তা এসেছিস ভালো কথা, দুটো ভালোমন্দ গল্প কর, ফিশফ্রাই খা, বিদেয় নে। তা না। ফিশফ্রাইয়ের প্লেটটার দিকে সে এমন ভাবে তাকালে যেন রিচি বেনোকে গোপালগঞ্জ বালক সঙ্ঘের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পিচ পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
"জামাইবাবু, ফিশফ্রাই আনানোর কী দরকার ছিল। আমি এলাম আপনার হালহকিকতের খবর নিতে.."
"তা বললে কি হয় ব্রাদার। না খেলে ছাড়ছি না। হে হে হে"।
"পাড়ার দোকান"?
"এই তো, বাড়ি থেকে বেরিয়ে দশ পা এগোতেই মোহনের দোকান। ভারি চমৎকার ফ্রাই করে বুঝলে হে"।
"মোহন? কোনো রিলেটিলে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। তা এ'টা কি রোডসাইড স্টল না রেস্টুরেন্ট"?
"তা ওই, ইয়ে, গুমটি চপের দোকান বলতে পারো"।
"আসলে রেস্টুরেন্ট হলে হাইজিন ব্যাপারটা একটু বেটার থাকে। তবে আই ডোন্ট মাইন্ড"।
"মোহনের চপের দোকানটা বেশি পরিষ্কার। আর হাইকোয়ালিটি। গ্যারেন্টি"।
"এ যুগে গ্যারেন্টির কোনো দাম নেই। সেই তো পাম অয়েল রিসাইকেল করে করে ডিজেল করে দেওয়া। পয়জন। পয়জন"।
"ও। তা'হলে ফিশফ্রাইটা থাক। আমি বরং দইচিড়ে মেখে আনি। কেমন? ঘরে পাতা দই বুঝলে.."।
"ইয়ে। না না। ব্যস্ত হবেন না। আমরা ইয়াং চ্যাপ। লোহাকে বিটুমেনের ব্যাটারে ভেজে দিলেও ডাইজেস্ট করে নেবো। দিন দেখি.."।
"এই যে ভায়া। সঙ্গে কাসুন্দি"।
"জামাইবাবু। এ'টা কি ভেটকি না বাসা"?
"ভেটকিই তো বলে মোহন। আমারও তাই বিশ্বাস"।
"বিশ্বাস করবেন না। আজকাল ফাইভস্টারেও ভেটকির বদলে বাসা দিচ্ছে আর এ'দিকে আপনি পাড়ার চপওলাকে বিশ্বাস করছেন। অবশ্য গড়িয়াহাটের সমরদার থেকে ভোর ছ'টায় গিয়ে যদি মাছ কিনতে পারেন আর আমার রেফারেন্স দিতে না ভোলেন, হাইক্লাস ভেটকি পাবেন। লিখে দিচ্ছি। এমএলএর মেয়ের বিয়েতে আমিই তো তিরিশ কিলো ভেটকি আনিয়ে দিলাম"।
"অ। বেশ। আমি মোহনকে বলে দেব। তা, ফ্রাইটা কি খাবে"?
"ভালো করে দেখুন জামাইবাবু"।
"কী দেখবো বলো দেখি ভাই পিন্টু"?
"ফ্রাইটার টেক্সচার দেখুন। পরতটা জাস্ট বেশি মোটা করে ফেলেছে। আপনারা হয়তো ধরতে পারবেন না। কিন্তু এ'সব ব্যাপারে আমার নজর একটু উঁচু বুঝলেন জামাইবাবু। আর ডোন্ট মাইন্ড। আমি একটু ব্রুটালি অনেস্ট এইসব কোয়ালিটির ব্যাপারে।
-"হুম"।
- "তা'ছাড়া এই যে দেখুন কাসুন্দি। গন্ধটা ভালো কিন্তু নির্ঘাৎ জল মিশিয়েছে। কনসেন্ট্রেশন এলোঝেলো হয়ে গেছে। এই এ কী..."।
- "ঢের হয়েছে"।
- "ও কী জামাইবাবু! ফিশফ্রাই কেড়ে নিলেন কেন? সবে কামড় বসাতে যাচ্ছিলাম"!
- "পিন্টু। তুমি এ ফিশফ্রাইয়ে কামড় বসানোর আগে আমি তোমার ঘাড়ে কামড় বসাবো"।
চারটে মোক্ষম গাঁট্টাসহ পিন্টুকে বিদেয় করতে পেরে সিধুবাবু বড় আনন্দলাভ করলেন। তা'ছাড়া শালাকে চিল্লিয়ে শালা বলে ডাকার মধ্যে যে এত তৃপ্তি আছে সে'কথা তিনি এর আগে টের পাননি। এরপর জোড়া ফিশফ্রাই নিয়ে যখন ভদ্রলোক ডাইনিংটেবিলে বসলেন, সন্ধেটা ঝলমল করে উঠলো।
No comments:
Post a Comment