Monday, October 4, 2021

ফেলে আসা সেলুনদাদা



বই পড়া টিভি দেখা গান শোনার মত আমি নিয়মিত নিজের ফোনে গুগল ফটোস দেখি৷ আমার হাতের লেখা আর ছবি তোলার হাত; দু'টোই শোচনীয়। কিন্তু গুগল ফটোস উপভোগ করার জন্য ফটোগ্রাফি চ্যাম্পিয়ন না হলেও দিব্যি চলে যায়৷ শুধু যখন তখন খুচুরখুচুর ছবি তোলার বদ অভ্যাস থাকলেই হল৷ আজ যে'সব ছবি অদরকারী, বিটকেল, 'ওয়েস্ট অফ মোবাইল স্টোরেজ'; আজ থেকে বছরখানেক পর সেগুলোই জমজমাট মনে হবে৷ পুরনো গন্ধ, দৃশ্য, শব্দ ফেরত আসবে, ব্রেনে সুড়সুড়ি দেবে৷ বয়সের গাছপাথর থাকছে না ভেবে অল্প নার্ভাসও হতে হবে অবশ্য৷ সে যাক গে৷
এই যেমন কলকাতায় ফেলে আসা অফিস যাতায়াতের রাস্তাঘাট নিয়ে মনের মধ্যে কম বিরক্তি জমে নেই৷ কিন্তু আজ হঠাৎ সেই অফিসমুখো রাস্তার ধারে পরিচিত সেলুনের সেলুনের সুপরিচিত বেঞ্চি দেখে মনের মধ্যে সুগভীর 'আহা রে' টের পেলাম। অফিস যাওয়ার মুখে নির্ঘাৎ বিচ্ছিরি জ্যামে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অকারণ খিটমিটে মেজাজে তোলা এই ছবি৷ কেন তুলেছিলাম জানি না, তবে ছবি জমানোটা আমার বাতিক৷
দোকান তখনও 'বউনি' করেনি। সেলুনদাদা নিশ্চয়ই ভিতরে ঝাড়পোঁছে ব্যস্ত ছিলেন৷ মনে পড়ল, ওই চেয়ারে বসে আমি বিস্তর চুল কাটিয়েছি৷ সেলুনদাদার চুল ছাঁটাইয়ের ব্যাপারে শখ-শৌখিনতার ধার ধারতেন না৷ ওঁর কাছে চুল কাটার তিনটেই ফর্ম্যাট ছিল; 'সেট' করে দেওয়া, মাঝারি আর বাটি ছাঁট৷ আমি যে ক'বার এ'খানে ঢুঁ মেরেছি, "মাঝারি" বলে নিশ্চিন্তে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছি।
তবে সেই সেলুনে আমি চুলের বাহারের জন্য যেতাম না। যেতাম চুল কাটানোর আরামের জন্য৷ সেলুনদাদা টুকটুক করে, অসীম ধৈর্য নিয়ে, ধীরেসুস্থে চুল কাটতেন৷ কাঁচি খচরখচর করে চুলের মধ্যে চলত না, বরং কাটুরকুটুর মিহি শব্দ আর টুকটাক ছোঁয়ায় চলত কাটাকুটি৷ ওই আধুনিক সব ট্রিমার গোছের যন্ত্র ব্যবহার করে ঘসঘসিয়েও চুল উড়িয়ে দিতেন না৷ কাঁচির ওই টিকিটাকা মুভমেন্টেই কামাল হত, জম্পেশ ঘুম চলে আসত চোখে৷ আমি তো চেয়ারে বসে সেই যে চোখ বুজতাম, চুল কাটার পর নবরত্ন তেল মালিশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে হত না৷ সেলুনদাদা গপ্পিয়ে মানুষ, তবে খুচরক 'হুঁ, হাঁ, তাই তো''র বেশি সঙ্গত দিতে হত না৷ বরং কাঁচির কচকচের সঙ্গে তাঁর অনর্গল কমেন্ট্রি মিলেনিশে বেশ মনোরোম একটা রিল্যাক্সিং অডিও ককটেল তৈরি হত৷
আজ গুগল ফটোস ঘাঁটতে গিয়ে বেমক্কা এই ছবিটায় চোখ পড়ল। নজরে এলো সেলুনের সেই নীল চেয়ার৷ অমনি শুনতে পেলাম সেলুনদাদার খোশগল্প। কানের পাশেও যেন কাঁচির ডগার মোলায়েম সুড়সুড় টের পেলাম। আর, নাকে এলো ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশন আর নবরত্ন-কুল হেয়ার অয়েল মেশানো গন্ধ৷ গুগল ফটোসের সত্যিই জবাব নেই৷

No comments:

পুরনো লেখা