Saturday, July 25, 2020

প্যান্ডেমিকের পুজোর প্ল্যান


- কী ব্যাপার ছোটকা? ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে মেডিটেট করছ নাকি?

- জুলাই মাস শেষ হতে চলল রে নিতাই।

- তা'তে কী?

- বছর এই সময়টা..।

- এই সময়টায় কী?

- এই সময় আমার বসকে তেল দেওয়ার কথা। বস নাচতে বললে ধেইধেই করব, বাজে চুটকি বললে হেসে গড়াগড়ি খাব, বসের ক্যাটক্যাটে রঙের বিশ্রী শার্ট দেখে বলব 'লুকিং অসাম'।

- বসকে তেল? ও মা, তুমি নাকি কেরিয়ারের জুজুকে পাত্তাটাত্তা দাও না৷ তা'হলে আবার আপিসিও তৈলমর্দন কেন?

- কেরিয়ার? প্রমোশনটমোশনের তোয়াক্কা? তা আমি সত্যিই করিনা। একার সংসার। ইএমআইয়ের ফাঁদে পা দিই না।  বসের তোয়াক্কা আমি করবই বা কেন? তবে...।

- তবে?

-  তবে পুজোর ছুটি আদায় করার জন্য আমি  মা কালীর পায়ে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো ঠেকিয়ে নিতেও হেসিটেট করব না। বসকে তেল তো কুছ ভি নহি।

- ও। তা, তুমি বুঝি জুলাই মাস থেকে বসকে তেল দেওয়া শুরু কর? পুজোর ছুটি আদায়ের জন্য?

- শুরু করি জুন থেকে। মালিশ করে করে তাঁর ঘেউঘেউ মেজাজ নরম করে মিউমিউতে আনতে মাসখানেক লাগে। আর তারপর শুরু হয় রিয়েল স্ট্রাগল। 

- লেট মি গেস। আইআরসিটিসির ওয়েটিং লিস্ট?

- পেরেকের মাথায় ঘা দিয়েছিস। এই সময়টায় শিলিগুড়িমুখো সমস্ত ট্রেন ওয়েটলিস্টে থাকার কথা। মেজদা রেলের বড় অফিসার, ওর কাছে দু'দিন রাবড়ি নিয়ে যেতে হবে। যদি একটু বলেকয়ে কনফার্ম করাতে পারে। ওর আবার বড় বেফালতু আইডিয়ালিজমের বাতিক। মেজদার রাবড়ি ফেল করলে লাটুগুণ্ডার কাছে রামের বোতল নিয়ে যাওয়া। 

- লাটু? বোমা বাঁধতে গিয়ে যার..?

- লাটুর নিজের ডানহাতটা নেই বটে। তবে ও পাড়ার এমএলএ'র রাইট হ্যান্ড। লাটু চাইলে হিল্লে একটা হয়েই যায়। জুলাইয়ের মধ্যে টিকিটের ব্যাপারটা ফাইনাল হলেই মন ফুর্তিতে ডগমগ। তখন জমে অন্য খেল, দ্য গ্রেটেস্ট পুজো কনানড্রাম। 

- পাহাড় না জঙ্গল...তাই তো?

- ইউ আর আ ব্রাইট চ্যাপ নিতাই। এই জন্যেই যখনই আমি পাঁঠা কষাই; তোকে ডাকি৷ 

- পাহাড় আর জঙ্গলের হিসেবটা কী'ভাবে ম্যানেজ করো?

- নট ইজি। নিজের মনের মধ্যে ডুবসাঁতার দিতে হয়। নিজের মেজাজকে অ্যানালাইজ করতে হয়, বুকের ধুকপুককে ডিকোড করতে হয়। কখনও নিজেকে দাদার কীর্তির কেদারের সঙ্গে আইডেন্টিফাই করি; ওই যে, 'স্বপ্নের নেচারটা ফোকাস'। তখন বুঝি যে এ'বারে পাহাড়ের ভাবগম্ভীর স্নেহ ছাড়া গতি নেই। আবার কোনও বছর নিজের মনের গভীরে পৌঁছে টের পাই যে আমি ওই সাহেব সিনেমার গোলকিপারের মত অস্থির হয়ে আছি; এ'বার জঙ্গলের মায়ায় নিজেকে বেঁধে না ফেললেই নয়। এই গোটা প্রসেসটা যেমন পোয়েটিক, তেমনই মিউজিকাল। 

- আর এ'বারে সেই কবিতা আর সঙ্গীত দু'টোই গেল জলে।

- রাস্কেল করোনা। নিনকমপুপ। হাড় জ্বালিয়ে ছাড়লে। কবিতা ডকে আর সঙ্গীত গোল্লায়৷ জুলাই শেষ হতে চলল অথচ পুজোয় ছুটি বাগানোর কোনও গা নেই। বসের গাম্বাট ঠাট্টাগুলো শুনলেই গা চিড়বিড়িয়ে উঠছে। ব্রাউজারে আইআরসিটিসি টাইপ করলেই কান্না পাচ্ছে৷ মেজদা রাবড়ির আব্দার করে ফোন করেছিল, ওর শুগার তুলে খোঁটা দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছি৷ লাটুকে দেখলেই ইচ্ছে করছে কান মলে দিতে। 

- খুবই চিন্তার ব্যাপার ছোটকা।

- ক্যাটাক্লিজমিক কেস। জুলাই শেষ হতে চলল। কোথায় এখন স্টলে গিয়ে পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলার খোঁজ করব! তা না! পুজোয় কী ব্র‍্যান্ডের অক্সিমিটার কিনব সেই ভেবে হদ্দ হচ্ছি। 

- মনখারাপ? খুব? ছোটকা?

- বুঝলি নিতাই, পড়াশোনায় চিরকাল মিডিওকার ছিলাম। প্রেম ব্যাপারটাও ঠিকঠাক এক্সেকিউট করতে পারলাম না। এখন কলম পেষাই করে মাসমাইনে আদায় করি৷ এক্সট্রা কারিকুলার বলতে লবডঙ্কা।  জীবনে একটাই পয়েন্ট অফ এক্সেলেন্স ছিল; পুজোর ছুটির প্ল্যানিং। এই করোনার খপ্পরে পড়েও সে'টা গেল কেঁচে। গুরুদক্ষিণা সিনেমায় সুগায়ক ভালোমানুষটি যখন গাইতে চেয়েও গাইতে পারছেন না; সে না পারার যন্ত্রণাটা যে কী অপরিসীম তা আজ আমি ঠাহর করতে পারছি৷

No comments:

দ্য গ্র‍্যান্ড তুকতাক

- কী চাই? - হুঁ? - কী চাই? চাকরীতে টপাটপ প্রমোশন বাগানোর মাদুলি? শুগার কন্ট্রোলে রাখার তাবিজ? হাড়বজ্জাত মানুষজনের বদনজর এড়িয়ে চল...