Tuesday, July 2, 2019

তুক ক্রিকেট


আমার ধারণা কুসংস্কার না থাকলে বোধ হয় স্পোর্টস-ফ্যান হওয়াতে সাংবিধানিক বাধা আছে। বিশেষত ক্রিকেটে; যে'খানে প্রতিটি বলের মধ্যে বেশ কিছু সেকেন্ডের বিরতি থাকে; সেই মুহূর্তগুলোয় সোফা-কুশন-চেবানো মামুলি ফ্যানেরা টিভির দিকে তাকিয়ে ছটফট করা ছাড়া তেমন কিছুই করে উঠতে পারেনা। ফুটবলের ক্ষেত্রে গোটা ব্যাপারটা স্যাট করে শুরু হয়ে ফ্যাট করে শেষ হয়ে যায়; ম্যাচ চলাকালীন ব্রেনকে সোজাসুজি অ্যাড্রেনালিনের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। কিন্তু ক্রিকেট সে তুলনায় রীতিমত বিষাক্ত। ওই ব্যাটসম্যান হেলমেট খুলে ড্রেসিংরুমের দিকে কিছু ইশারা করলেন, এই বোলার মিড অফে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে সামান্য থমকালেন; এমন হাজারো অ-স্কোরবোর্ডিও সিচুয়েশন আর নখ খাওয়ার সুযোগে ভরপুর এই ভল্ডেমর্টিও খেলাটা।

আমার এক পাড়াতুতো কাকু কমিউনিস্ট; মানে পরশুরামের কুঠারকে টুথপিক হিসেবে ব্যবহার করা কমিউনিস্ট। ভদ্রলোক ভোগের খিচুড়িতে দু'ফোঁটা ভডকা ছিটিয়ে শুদ্ধ না করে মুখে তুলতে পারতেন না। তিনিও দেখেছি ম্যাচ খুব খটমট জায়গায় পৌঁছলে চটপট মানত করে ফেলতেন। বহুদিন আগে, সেই কাকুর পাশে বসে ভারত পাকিস্তান ফাইনাল দেখছিলাম। ডান পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে যাওয়ায় ঘণ্টাখানেক পর বসার পোজিশনে ইঞ্চিখানেক অ্যাডজাস্টমেন্ট করেছিলাম আর তখনই সৌরভ আউট। কাকুর সে কী হাহাকার; "কুলীন বংশের ছেলে আমি; সময়মত পৈতে হলে এখন তোকে স্রেফ অভিশাপে অভিশাপে শেষ করে দিতাম! পা নড়ানোর আর সময় পেলিনা? এ'বার ম্যাচ হারলে দায়টা কে নেবে?"।

জটিল সিচুয়েশনে কারণে অকারণে বাথরুম ছোটার ব্যাপারটা খুবই খতরনাক। বাথরুমে গেলেই মনে হয় ম্যাচ ভাসিয়ে চলে গেলাম; মাঠের খেলোয়াড়রা তো শুধু দ্যাখনাই, ভাগ্যের আসল কন্ট্রোলপ্যানেল তো আমার ব্ল্যাডারে। আবার এও হয়েছে বিপক্ষের খুনে ব্যাটসম্যানদের দাপটে যেই হাল ছেড়ে বাথরুম গেছি, অমনি উইকেট পড়েছে; এ'বার সামলাও ঠেলা। মাঠের ক্যাপ্টেন আর প্যাভিলিয়নে বসা ম্যানেজারের চেয়েও আমার চাপ বেশি; কারণ লিটার লিটার জল খেয়ে বিপক্ষের পার্টনারশিপ ভাঙার গুরু-দায়িত্ব যে আমার কাঁধে।

এই হাড়-জ্বালানো কুসংস্কারগুলোর বিভিন্ন স্তরে খেলা করে।

প্রথমত, ম্যাচের আগে। যত বড় ম্যাচ, তত দুর্বল মন। পয়া জামা, পয়া বসার পোজিশন, পয়া রিমোট ধরার কায়দা, পয়া মায়ের চিৎকার, পয়া ছড়া যা ম্যাচের আগে জাতীয় সঙ্গীতের মত আওড়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়; এমন লম্বা ফর্দ ধরে ব্যূহরচনা করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রিয় ব্যাটসম্যান ভালো খেললে। বসার জায়গা থেকে না নড়া, অতিরিক্ত কথা না বলা (যে'টুকু বলা সে'টুকু প্যাটার্নে, যেমন প্রতি ওভারে তিন আর চার নম্বর বলের মধ্যে কথা বলা যাবে, নচেৎ স্পিকটি নট), কলিং বেল/টেলিফোনে সাড়া না দেওয়া, অন্যদের নড়তে না দেওয়া ইত্যাদি।

তৃতীয়ত, বিপক্ষ ব্যাটসম্যান বেধড়ক পেটাচ্ছে বা নিজদের উইকেট পর পর পড়ে চলেছে। ম্যাচ নিয়ে টানাটানি, রীতিমত ক্রাইসিস। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের পদ্ধতিতে আবার আগ্রাসী না হলে চলবে না। উপায়? চ্যানেল বদলানো; ছেলেবেলায় আমার ভাগ্য ফেরানোর চ্যানেল ছিল জি বা আলফা বাংলা। 'এক আকাশের নীচে' সিরিয়ালটার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম স্রেফ নিজেদের একটা পার্টনারশিপ তৈরির চেষ্টায় বা বিপক্ষের পার্টনারশিপ ভাঙার লোভে। তা'তেও কাজ না হলে নেক্সট লেভেল হল খানিকক্ষণের জন্য টিভি বন্ধ রাখা। তা'তেও ভাগ্যের চাকা না ঘুরলে বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসতে হবে, শাস্ত্রে বোধ হয় তাই বলেছে। ২০১১র বিশ্বকাপ ফাইনালে শচীন শেওয়াগ আউট হওয়ার পর আমায় ছাতে গিয়ে পায়চারী করতে হয়েছিল যাতে কোহলি আর গম্ভীর একটু নিজেদের মত করে দাঁড়াতে পারে।

চতুর্থ, ১৩ রান (১৩ নাকি অপয়া এ'দিকে কেউ বেড়াল দেখে থমকে দাঁড়ালে তাকে নিউটন তুলে গালাগাল দিয়ে থাকি) বা ১১১র নেলসন/ডাবল নেলসন/ট্রিপল নেলসন গোছের শেফার্ডসাহেব-সার্টিফাইড ক্রিকেট-অপয়া সংখ্যা বা সতেরো, তিয়াত্তর বা একশো সাত গোছের কিছু সংখ্যা (কোনও কারণ নেই, এগুলো স্রেফ নিজের অপছন্দের নম্বর)স্কোরবোর্ডে দেখলেই সজাগ হয়ে উঠতে হয়। এই সব দুঃসময়ে বিপদ কাটাতে দুর্বল কলজে খুব ন্যক্কারজনক কিছু শর্টকাট অবলম্বন করে থাকে। এই যেমন গায়ত্রী মন্ত্রের রিদমে হাট্টিমাটিম বিড়বিড় করা বা "কত না ভাগ্যে আমার, এ জীবন ধন্য হল, সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল..." গোছের টোটকা গান গাওয়া; খুব কাজে লাগে, যাকে বলে সুপার-এফেক্টিভ।

তবে এ'সবই নিজের নোটবুকের হিসেবকিতেব, আমি নিশ্চিত প্রত্যেকের নিজস্ব ক্রিকেট দেখার মানসিক-মাদুলির ফর্দ রয়েছে। আজকের ম্যাচে রোহিতের সেঞ্চুরি পর্যন্ত বড় বেকায়দা পোজিশনে শুয়ে থাকতে হল, এমন কী সেঞ্চুরির পরেও নড়তে সাহস হয়নি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ বলে কথা। নেহাত ঘাড়ের কাছের চুলকানিটা চেরনোবিলের আকার ধারণ করায় সামান্য নড়েছিলাম আর ভুডু-অঙ্কের নিখুঁত প্রভাবে রোহিত অমনি লোপ্পা ক্যাচ তুলে দিয়েছিল। স্যাড়াক্‌ করে অরিজিনাল পোজিশনে ফেরত আসতে হয়েছে যাতে ডেভিড মিলার রোহিতের তোলা ক্যাচটা বিনা গোলমালে ফেলতে পারেন। মোটের ওপর এই ম্যাচটা বিরাটদের ভালোয় ভালোয় উতরে দিয়েছি কিন্তু আগামী দু'দিন আমার মাথা আর ঘাড়ের ডান দিকে বত্রিশখানা ছুঁচ ফোটালেও টের পাব না।

জয় হিন্দ।

No comments:

দাদার লাইব্রেরি

- দাদা। - কী ব্যাপার পিলু? এত রাত্রে? - মনে হল তুই হয়ত এখনও ঘুমোসনি। তাই ভাবলাম যাই একবার...। - আয়। বস। - কী পড়ছিস? -  ইংরেজি নভ...