Skip to main content

সিরিয়ার গল্পগুলো


দেশের এবং দশের ইতিহাস বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়বে সমষ্টিগত চাওয়া, পাওয়া এবং হারানোর গল্প। সে'খানে নেতৃস্থানীয় মানুষদের (তা রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক, সামরিক হোক বা অসামরিক, ভালোর দলে হোক বা মন্দের) কথাও অবশ্যই বলতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের গল্পে সচরাচর ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সাধারণ মানুষের পার্স্পেক্টিভ উঠে আসে না। বা কখনও উঠে এলেও তা স্রেফ অলঙ্কার হয়েই থাকে; শুধুই সে সব গড়পড়তা মানুষের অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে ইতিহাস রচনা করা চলে না। এ'টা কোনো ক্ষোভ থেকে বলা নয়, বরং এ'টাই বাস্তব। স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন আমাদের ফোকাস পড়তেই পারে ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারির ওপর। আর সেই দিনটার ব্যাপারে দরকারি কিছু লিখতে হলে স্বাভাবিক ভাবেই আমি জানতে চাইব সে'দিন সকালটা মোহনদাস কী ভাবে কাটিয়েছিলেন বা গডসে কী ভাবছিলেন বা দেশভাগের আগুন রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছিলেন। কিন্তু সেই ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারি বুঝতে গিয়ে কি আমি সে'দিনটা একজন করোলবাগের ফলবিক্রেতার জন্য কেমন কেটেছিল; সে'টা জানতে চাইব? বা নবদ্বীপের এক মুদীখানার মালিক সে'দিন বিকেলে কী করেছিলেন; তা জানতে পারলে আমার ইতিহাস-বোধ কতটা পূর্ণতা লাভ করবে? আমার ধারণা ছিল সে সব অভিজ্ঞতা সাহিত্যে রস যোগাতে পারলেও তা দিয়ে ইতিহাসকে যথাযথ ভাবে চেনা সম্ভব নয়।

কিন্তু তার পাশাপাশি প্রায়ই মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের জবানিতে যদি ইতিহাস পালটে যাওয়ার গল্প শুনি; কেমন লাগবে? তেমন কিছু লেখা অবশ্যই পড়েছি দেশভাগ বা নাৎসি অত্যাচারের মর্মান্তিক অধ্যায় নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে; তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে যোগ করতে হয়েছে ঐতিহাসিকের ন্যারেশন ও কমেন্ট্রি। কোনো রকম ন্যারেশন ছাড়া, শুধু মাত্র সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন দিনলিপি থেকে অসাধারণ নির্জাসটুকু তুলে নিয়ে; এই বই যে নিষ্ঠার সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেছে তা এক কথায় অনবদ্য।  আর আটপৌরে অভিজ্ঞতাগুলো এক সুতোয় সঠিক প্যাটার্নে গাঁথতে পারলে; স্বৈরাচার, বিপ্লব, ব্যর্থতা ও মানুষের যন্ত্রণার গল্পগুলো আপনা থেকেই সাহিত্যগুণে ভরপুর হয়ে ওঠে।

এখন মনে হচ্ছে; ল্যাপিয়ারের ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট যদি লেখকের ন্যারেশন ছাড়া; দিল্লীর কোনো খেটে খাওয়া চা-ওলা, পুরুলিয়ার কোনো দরিদ্র চাষি, ভাগলপুরের কোনো সৎ স্কুলমাস্টার,  করাচীর কোনো সরল সাহিত্যিক, মুম্বইয়ের কোনো ব্যর্থ থিয়েটার শিল্পী আর শ্রীনগরের কোনো ট্রাকড্রাইভারের অভিজ্ঞিতা জড়ো করে লেখা হত? তা'তে ইতিহাসের ব্যঞ্জনা সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত?

এই বই পেরেছে। চমৎকার ভাবেই পেরেছে। এবং এমন ভাবে তুলে ধরেছে যে মনে হয়েছে সিরিয়া দেশটা বোধ হয় খুব দূরে নয়; সে মানুষগুলোও বোধ অনতিদূরেই জটলা বেঁধে বসে; তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের শিউরে ওঠাটা শীতের ছাতে খালি গায়ে হেঁটে আসার মতই রীতিমত স্বাভাবিক। মা, ছেলে, মেয়ে, বাবা, শিক্ষক, ছাত্র, চাকুরে, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ; কত মানুষকে নিজেদের ঘর এবং সর্বস্ব ভাসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তাঁরা সিরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন স্রেফ বেঁচে থাকার দুঃসাহসী স্বপ্ন নিয়ে; আর তাঁদের অভিজ্ঞতা পর পর সাজিয়ে লেখিকা বলেছেন আসাদ এবং তাঁর বাথপার্টির অত্যাচার, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ,  বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমস্ত হারানো মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের গল্প।

বইয়ে লেখা ঘটনাগুলো এখানে লেখার মনে হয়না। মানুষ নিজের যন্ত্রণা নিজে যে কোনো সাহিত্যিকের থেকে ভালো ভাবে বলতে পারবেন সে'টাই স্বাভাবিক আর সেই অভিজ্ঞতার থেকে প্যাটার্ন খুঁজে ইতিহাস চিনে নিতে পারার মধ্যেই বোধ হয় সার্থকতা।  আমাদের স্কুলের ইতিহাস বইগুলো যদি এমন হত কী ভালোই না লাগত পড়তে।

দু'টো ব্যাপার নিয়ে এ বই বেশ ভাবিয়েছে।

এক, কথায় কথায় অমুক রাজনৈতিক দল আইসিসের মত বা অমুক নেতা অবিকল হিটলার বা আমাদের স্বাধীনতা বলে কিস্যু নেই; এমন কথা বলার আগে বত্রিশ বার ভেবে নেওয়া উচিৎ। সিরিয়া বা সুদান বা হলোকস্টের রোষে পড়া মানুষগুলো যে পরিমাণে স্বৈরাচার ও অত্যাচার সহ্য করেছে/ করে চলেছেন; তার তুলনায় আমরা রীতিমত স্বর্গে বাস করছি। ফস্ করে নিজেদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা টেনে বসাটা সেই মানুষদের জীবন সংগ্রামের প্রতি অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়।

দুই, যারা সরকারে রয়েছেন, ক্ষমতা যাদের হাতে; তাঁদের চাঁচাছোলা নিন্দে করে যেতেই হবে। একটানা, অক্লান্তভাবে।  তাঁদের ব্যাপারে গদগদ হয়ে পড়ার কোনো মানেই হয়না। আমাজনের কাস্টোমার কেয়ারের থেকে নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা যতটা ক্ষুরধার,  তার কয়েক হাজারগুণ বেশি খুঁতখুঁতে হতে হবে নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী,  এমপি ও এমএলএ-দের ব্যাপারে। নিজেদের কোনো এক নেতায় বা মতবাদে (বা তার বিরোধিতায়)চোখ বুজে সঁপে দেওয়া মানেই দেশকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করা।

Comments

Popular posts from this blog

গোয়েন্দা গল্প

- কিছু মনে করবেন না মিস্টার দত্ত...আপনার কথাবার্তাগুলো আর কিছুতেই সিরিয়াসলি নেওয়া যাচ্ছে না।  - কেন? কেন বলুন তো ইন্সপেক্টর? - ভোররাতে এই থানা থেকে একশো ফুট দূরত্বে ফুটপাথে আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।  - আপনার কনস্টেবল নিজের চোখে দেখেছে তো।  - না না, সে'টাকে আমি কোশ্চেন করছি না। আমি শুধু সামারাইজ করছি। আপনার গায়ে দামী চিকনের পাঞ্জাবী, ঘড়িটার ডায়ালও সোনার হলে অবাক হব না। এ'রকম কাউকে বড় একটা ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। যা হোক। হরিমোহন কনস্টেবলের কাঁধে ভর দিয়ে আপনি থানায় এলেন। জলটল খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেন। অল ইজ ওয়েল। নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের সামান্যতম ট্রেসও নেই। শরীরে নেই কোনও চোট আঘাত।  - আমার কথা আমায় বলে কী লাভ হচ্ছে? আমি যে জরুরী ব্যাপারটা জানাতে মাঝরাতে ছুটে এসেছিলাম...সেই ব্যাপারটা দেখুন...। ব্যাপারটা আর্জেন্ট ইন্সপেক্টর মিশ্র।  - আর্জেন্সিতে পরে আসছি। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আপনি থানায় ছুটে এসেছিলেন। ওয়েল অ্যান্ড গুড। কিন্তু...ফুটপাথে পড়ে রইলেন কেন...।  - এ'টাই, এ'টাই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। মাথাটাথা ঘুরে গেছিল হয়ত। আফটার অল বা

পকেটমার রবীন্দ্রনাথ

১ । চাপা উত্তেজনায় রবীন্দ্রনাথের ভিতরটা এক্কেবারে ছটফট করছিল । তার হাতে ঝোলানো কালো পলিথিনের প্যাকেটে যে ' টা আছে , সে ' টা ভেবেই নোলা ছুকছাক আর বুক ধড়ফড় । এমনিতে আলুথালু গতিতে সে হেঁটে অভ্যস্ত । তাড়াহুড়ো তার ধাতে সয় না মোটে । কিন্তু আজ ব্যাপারটা আলাদা । সে মাংস নিয়ে ফিরছে । হোক না মোটে আড়াই ' শ গ্রাম , তবু , কচি পাঁঠা বলে কথা । সহৃদয় আলম মিয়াঁ উপরি এক টুকরো মেটেও দিয়ে দিয়েছে । তোফা ! নিজের লম্বা দাড়ি দুলিয়ে ডবল গতিতে পা চালিয়ে সে এগোচ্ছিল ।   গলির মোড়ের দিকে এসে পৌঁছতে রবীন্দ্রনাথের কেমন যেন একটু সন্দেহ হল । ঠিক যেন কেউ পিছু নিয়েছে । দু ' একবার ঘাড় ঘুরিয়েও অবশ্য কাউকে দেখা গেলনা । ভাবনা ঝেড়ে ফেলে মাংসের পাকেটটায় মন ফিরিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ । বৌ নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে আজ । খোকাটাকে যে কদ্দিন মাংসের ঝোল খাওয়ানো হয়নি ।   খাসির রান্নার গন্ধ ভেবে বড় গান পাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের । সে বাধ্য হয়েই একটা কুমার শানুর গাওয়া আশিকি সিনেমার গান ধরলে ।

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে

- মিস্টার চ্যাটার্জী...। - কে? - আমার নাম বিনোদ। - আমি তো আপনাকে ঠিক...। - আমায় বস পাঠিয়েছেন। - ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...। - বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব। - আসুন, ভিতরে আসুন। - আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে। - যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না? - এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। - প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই। - কী দরকার বলুন জামা পালটে। - দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন। - ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। - ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...। - মিতু