Sunday, October 1, 2017

বিপিনবাবুর একাদশী

(এই লেখাটা ২০১৬তে 'এই সময়'য়ের জন্য লেখা, সে'বার একাদশী রোব্বারে পড়েনি)

বিপিনবাবুর জ্ঞান যখন ফিরলো তখন গোটা মুখে রোদ! গোটা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। মাথার বিশ্রী দপদপ আর ঝিমঝিম মেশানো অনুভূতিটা কিছুতেই যাচ্ছে না। শরীরটা মনে হচ্ছিল আড়াইশো কিলোর এক বস্তা লোহা।

“অফিস যাবে না নাকি”? বৌয়ের স্টিলের-বাসনপত্র-আছড়ে-পড়া কণ্ঠস্বরে বিপিনবাবুর মনের মধ্যে একটা সুতীব্র ঝাঁকুনি পড়ল। ঝাঁকুনি জিনিসটা খুব দরকারি। দৈনিক অটোরিকশার ঝাঁকুনিটাকে বিপিনবাবু ফ্রি জীম বলে ধরে নেন। আজকের এই বৌয়ের ডাকের ঝাঁকুনিটা তেঁতুলজলের কাজ করল। গোটা গা থেকে সিদ্ধির ভারটা এক ধাক্কায় অনেকটা নেমে গেল।

অফিস! পুজো খতম! একাদশী ইজ হিয়ার! অফিস! অফিস! অফিস! ঢনঢনিয়ার ফাইলের রিকনসিলিয়েশন, বড়সাহেবের চাওয়া গত কোয়ার্টারের রিভিউ স্টেটমেন্ট; একে একে সমস্ত পড়ে থাকা কাজ মাথায় হুড়মুড় করে এসে বুকের ভিতরের ঝিমঝিমে সিদ্ধি তন্দ্রাটা ঘুচিয়ে দিল। বমিবমি ভাব অবশ্য কম হল না।

ছয় গেলাস সিদ্ধি,

তারপর চার পিস পান্তুয়া,

তারপর দলের মেহেন্দির গানের তালে ধুনুচি নাচ। একটানা। ঠাকুর না ভাসানো পর্যন্ত।

সেই থেকে বুকের ভিতরটা এমন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় হয়ে গেলো। রাতের মাটন রেজালা আর রুমালি রুটিতেও সবিশেষ মন দেওয়া হয়নি। নেশা এমনই জবরদস্ত উঠেছিল যে রুমালি রুটিতে মাখাবার জন্য মাঝেমাঝেই জ্যাম আর ধনেপাতা বাটা চেয়ে বসছিলেন। নেহাত গিন্নী সামাল দিয়ে বের করেছে। তবে বিজয়া দশমীর ডিনার এদিক ওদিক হলেও, পুজোর বাকি দিনগুলো বিপিনবাবু মন্দ খেয়েছেন, তেমন কথা পরম শত্রুও বলবে না। জলখাবারে পাঁচ দিনই থেকেছে লুচি, সাথে কখনও বেগুন ভাজা , কখনও আলু ভাজা, কখনও আলুর দম, কখনও নারকোল কুচি দেওয়া ছোলার ডাল। সঙ্গে পায়েস (রকমফেরে) এবং দু’রকমের মিষ্টি। দুপুরের খাওয়া হয়েছে বাড়িতে। থেকেছে দু’রকম মাছ; অসময়ে ইলিশ থেকে শুরু করে মৌড়লা বা ট্যাঙরা বা লইঠ্যা বা বোয়াল বা কাঁকড়া বা চিংড়ী। সাথে চিকেন বা মাটন। মুর্গি বলতে অবশ্য দেশীই বোঝেন বিপিনবাবু, তাঁর মতে ব্রয়লারের ভাজা পিস দিয়ে ভাল টেনিস বল বানানো যেতে পারে। ডিনার কেটেছে রেস্তোরাঁ হপিং করে। বিপিনবাবু প্যান্ডেল হপিঙয়ে বিশ্বাস করেন না। তিনি পুজো বলতে পাড়ার পুজো মণ্ডপ বোঝেন, তার বাইরে সমস্তটাই অন্ধকার। পাড়ার মণ্ডপ আর খাওয়াদাওয়া। চাইনিজ টু মুঘলাই ডিনারের মাঝে টুকিটাকি রোল ফুচকায় ডাইভারসন থাকে অবশ্য থাকেই।

“অমন ড্যাবা চোখে বসে আছো যে এখনও? এ’দিকে সাড়ে সাতটা বাজতে চললো যে! খবরদার বাজার না করে যদি বাড়ি থেকে বেরিয়েছ”। ফের বৌয়ের গলায়  স্টিলের-বাসনপত্র-আছড়ে-পড়া হুমকি। ফের চমকে উঠে নিজের খোঁচা দাড়ির গাল চুলকে ফেলেন বিপিনবাবু।

অফিস! পুজো শেষ! সামান্য ভূমিকম্প অনুভূত হল কি? দু’সেকেন্ড তেমনটাই মনে হলেও বিপিনবাবু বুঝলেন তিনি নিজেই সামান্য দুলে উঠেছিলেন। ফের বড়সাহেব, ফের ইয়ে করো,উয়ো করো। পুজোর সমস্ত নবাবী খতম।

“ইয়ে, বাজার ফেরতা আজ কচুরি আনব”? ফতুয়াটা গলাতে গলাতে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন বিপিনবাবু।

“পুজোয় গজানো আড়াই হাতের ল্যাজটা এবার কাটো। পাঁচ দিন ধরে লুচি গিলে আজ আবার কচুরি? লক্ষ্মীপুজোর আগেই নিমতলায় যাওয়ার ইচ্ছে নাকি? ভালো করে দাঁড়াতে পারছেন না আবার কচুরি খাবেন। কচুরি আনলে আজ তোমারই একদিন কি আমারই একদিন। অনেক আদেখলামো আর জমিদারি সহ্য করেছি পুজোর এ কয়দিন। এবারে আমি যেমন বলব তেমনটি খাওয়া! আর জেলুসিল চাইলেও পাবে না, বলে রাখলাম”!

“ওহ। আচ্ছা বেশ। আজ জলখাবারে তাহলে...”।

“ছাতু”!

“ছা...ছা...”?

“ছাতু! নাম শোনোনি বাপের জন্মে মনে হচ্ছে”?

“ছাতু খাওয়াবে জলখাবারে, আর বাপ তুলে কথাও বলবে”?

“এক হপ্তার মধ্যে যদি তেলেভাজা কিছু খাওয়ার নাম শুনেছি, তাহলে আমি চোদ্দ-পুরুষ তুলে কথা বলব। পুলিশে কমপ্লেইন করব”।

“আচ্ছা বেশ। ছাতু”।

“নুন লেবু লঙ্কাকুচি পেঁয়াজকুচি দিয়ে গুলে দেব। অমৃতের চেয়ে কম নয়”।

“ছাতু! অমৃতসমান হতেও পারে গো, তাই বলে লুচি তো নয়”!

“গা জ্বালিও না তো! গা জ্বালিও না। চটপট বাজার করে এনে উদ্ধার করো”।

“মাছ আছে কি? না কি আনতে হবে”?

“চারাপোনা এনো। আমি পাতলা ঝোল করে দেব। সাথে ভাত আর শসা মুলো কুচোনো স্যালাড। আজ তোমার টিফিনে”।

“চা...চা...চার...”।

“আবার গোঙায় ধরলো দেখি। চারাপোনার ঝোল”!

“সঙ্গে মুলো”?

“পেট ক্লেন্স করতে হবে না! ওই ডিজেলে ভাজা চপ রোল যে’ভাবে কিলো কিলো খেয়েছ”!

“সকালে ছাতু আর দুপুরে চারাপোনার ঝোল আর ভাত। ওহ্‌!ক্লেন্সিং! বটে”!

“আর একটু কুমড়ো এনো বুঝলে! রাতে কুমড়োর ঝাল ছাড়া ছক্কা আর দু’টো রুটি” ।

"ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা"!

"ও মা! অমন নামতা পড়া শুরু করলে কেন"?

বিপিনবাবু বিড়বিড় করেই চললেন; “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা!ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!

অটোওলা খুচরো চাইলে তিনি ফস করে বলে বসলেনঃ “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”। অটোওলা আর ঘাঁটাতে সাহস না পেয়ে নিজে সুড়সুড় করে খুচরো বার করে ব্যাপারটা সামাল দিলেন।

অফিসের বড়সাহেব জিজ্ঞেস করলেন “হাউ ডু ইউ ডু”। বিপিনবাবু অম্লানবদনে বলে ফেললেন; “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”! বড়সাহেব চশমা কপালে তুলে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

পিসতুতো ভাই ফোন করে বিজয়ার প্রণাম জানালে, বিপিনবাবু বললেন “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!পিসতুতো ভাই “ক্রস কনেকশনের যুগ ফিরে এসেছে” বলে লাইন কেটে দিলেন।

অফিস ফেরতা রাতে খেতে বসে বিপিনবাবু যথারীতি গিন্নীকে বললেন “কই দাও! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!

গিন্নী থালায় সাজিয়ে দিলেন ফুলকো ডিমের কচুরি আর কিমা ঘুগনি। পাশে ঘরে বানানো নারকোলের সন্দেশ।

ফের সেই ঝাঁকুনি অনুভব করলেন বিপিনবাবু; ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কার তাল কেটে এ কী এলাহি ব্যাপার! আজ একাদশী যে! আজ যে ছাতু-মুলো দিবস।

“এ কী গো! আমার পেট ক্লেন্স করার কথা যে! কুমড়োর ছক্কা দিয়ে! এ’সব কী”? বিপিনবাবু বিহ্বল বোধ করছিলেন।

“সেই যে প্রথম বিয়ের পর, প্রথম বিজয়ার রাতে কী বলেছিলে খেয়াল আছে”? 

“ক্..কী? কী বলেছি?”

“বলেছিলে যে শাস্ত্রে আছে মেয়েদের বরের সাথে বিজয়া কোলাকুলিতেই সারা উচিৎ। গোপনে”।

“অ। ওহ! আচ্ছা! হ্যাঁ। তাই তো”।

“সকাল থেকে চারাপোনা ছাতু শুনে সেই যে নামতা পড়া শুরু করেছ, তখনই বুঝেছি গণ্ডগোল। তোমার পেট সাফ করতে গিয়ে আমাদের বিজয়ার কোলাকুলিটাই না নষ্ট করে ফেলি”।

“হেহ্! হেহ্‌ হে”!

“অমন হাঁ করে ড্যাবা চোখে বসে না থেকো কচুরিগুলো গিলে আমায় উদ্ধার করো দেখি। ও হ্যাঁ! কাল তো সিদ্ধিতে ডুবে ছিলে তাই বলা হয়নি। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানালাম। মন থেকে। আর খেয়ে ওঠো, তারপর প্রণামটা সেরে নেব’খন। আরও কচুরি দেব। গরমাগরম। ভাজছি কিন্তু”।

গিন্নীর হাতের খুন্তিটাকে যেন জগজ্জননীর ত্রিশূল বলে মনে হল বিপিনবাবুর! দেবীর তৃতীয় নয়ন সদা সজাগ থাকে, ভক্তের যন্ত্রণাকে ভুলেও অবহেলায় রাখেন না তিনি। বিপিনবাবু তক্ষুনি “ভালোবাসি গো, বিজয়ার শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ রইল’ বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চোখ ভরা ছলছল আর মুখভরা কচুরির গ্রাসে তাঁর মুখ দিয়ে কেবল বেরোল “বিববাব বুবেব্বা বো বাবীর্বাব বইবো”।

হট্টগোলের পৃথিবীতে এক জোড়া মানুষ হৃদয় উজাড় করে রান্নাঘর আলো করে পড়ে রইলেন। আফটার অল,  অষ্টমী সন্ধ্যে ইজ আ স্টেট অফ মাইন্ড।   

No comments: