Wednesday, July 27, 2016

মৃণালবাবুর শেষ স্বপ্ন

মৃণালবাবুর শেষ স্বপ্ন

নমস্কার। আমি মৃণাল দত্ত।

আমি ঠিক আপনার সাথে কথা বলছি না। নিজের মধ্যে বিড়বিড় করছি। ওহ, বলে রাখা ভালো যে আমি নিজের মধ্যেই রয়েছি। এই যে লাল দেওয়ালের ঘর দেখা যাচ্ছে, এটা আমার সাবকনশাস্‌। এই সোফাটা, যেটায় আমি বসে আছি; সে’টা সম্ভবত সিমলার পি ডাবলু ডি গেস্ট হাউসের ড্রয়িং রুমে রাখা ছিল; কালো চামড়ার, বড় আরামের। নাইনটি সিক্সে ঘুরতে গেছিলাম; সেখানকার সোফা যে এইভাবে মরমে পশেছিল সেটা আজ মালুম হচ্ছে।

যাক সে’সব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। হাতে সাত মিনিট আছে স্বপ্নে জীবন রিভিউ করার জন্য। আচ্ছা আমি কি বলেছি যে আমি মারা গেছি? এই জাস্ট! ভুগছিলাম। এক্সপেক্টেড ছিল। কিন্তু সে’সব এখন আননেসেসারি ডিটেইলস। মোদ্দা কথা হচ্ছে মগজের একদম ভেতরটা এখনও সক্রিয় রয়েছে। থাকবে আরও সাত আট মিনিট। সে জন্যেই এই সোফা আর লাল দেওয়াল। ওই সাদা আলোর ফোকাসের সোর্সটা ধরতে পারছি না; চোখে পড়ছে বটে কিন্তু অস্বস্তি হচ্ছে না। সাবকনশাসে মনে হয় সিগারেটের প্রয়োজন নেই। পকেটে বাক্স নেই দেখলাম।
যাক গে। হাতে যে কয় মিনিট আছে তাতে জীবনকে রিভিউ করে দেখে নিতে হবে। ইন দ্য ডিপেস্ট ড্রিম। না, না! এটা আমার শখ নয়। সায়েন্স। সাইকোলজি। বিভিন্ন আর্টিকেলে আমিও পড়েছিলাম। মরণোত্তর মগজের ভিতর স্বপ্নের সিনেমা রোল হয়, হাই লাইট্‌স চলে। একশো ওভারের ম্যাচ কয়েক মিনিটে। ইম্পর্ট্যান্ট শটগুলো, উইকেট আর টার্নিং পয়েন্টস।
কথায় সময় নষ্ট করছি কেন তাও বুঝতে পারছি না। হাতে সময় যখন এত কম। আর এত লম্বা জীবন ফিরে দেখার আছে। বিয়াল্লিশ বছর। চাট্টিখানি কথা নয়।

অবশ্য বুঝতে পারছি না বলা ভুল। স্মৃতি রোমন্থন ঠিকঠাক শুরু করতে পারছি, যার জন্যই এই আজেবাজে বকে মনকে বাগে আনার চেষ্টা।

কিছুতেই পারছি না। মন কে বাগে আনতে পারছি না। অবশ্য এটা তো আমার সাবকনশাসের মেজানাইন ফ্লোর। আমি কথা বলছি নিজের সঙ্গে। বৌ নেই, পাশের সিটে সহযাত্রী নেই; ভয়টা কীসের আমার!

বলছি।

উফ। গুছিয়ে বলতেও বা পারছি কই! সেই একই দৃশ্য ড্যালা পাকিয়ে ভেসে উঠছে। ইন ফ্যাক্ট সাদা আলোর ফোকাসও দৃশ্যটাকে ভাসিয়ে দিতে পারছে না।

আসলে হল কী; মরার ঠিক আগের মুহূর্তে বুকে অসহ্য যন্ত্রণা। যাকে বলে অসহ্য। চারিদিকে থেকে সক্কলে আমার ওপর ঝুঁকে। আমার বৌ রুমা, ডাক্তার সামন্ত, ছেলে অনিন্দ্য, আমার পিসতুতো বোন ইন্দু আর প্রতিবেশী দাসগুপ্তবাবু। সবাই কান্নাকাটি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছিল। দিব্যি যেমন হয় আর কী। এই গেল, সেই গেল একটা ইয়ে। কেউ মারা গেলে যেটুকু হইহইরইরই হয় সেটুকুই হচ্ছিল!। দিব্যি ছিল সব কিছু। আমি হন্যে হয়ে সক্কলের মুখের দিকে চাইছিলাম। ব্যথা বাড়তে বাড়তে পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ভিতরটা জাস্ট ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আচমকা। নো যন্ত্রণা, নাথিং।

তারপর থেকে আমি এই ঘরে। থুড়ি। সাবকনশাসে। স্পষ্ট টের পাচ্ছি এই ঘরটা আবছা হতে শুরু করেছে। স্বপ্নকে এই বেলা রোল না করালেই নয়। তবু। পারছি না। সমস্ত আটকে আছে ওই এক মুহূর্তে।

মরার আগে ডেস্পারেটলি সবার মুখের দিকে তাকালাম, শেষ দেখাটুকু খামচে নেওয়ার জন্য। অথচ এখন টের পাচ্ছি সে সময়ের কারুর মুখই মনে নেই। মনে আছে একটা মাত্র দৃশ্য, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের দেখা। এ সোফায় এসে বসার আগে টেরও পাইনি যে সে দৃশ্য মনে আদৌ দাগ কেটেছে। সাবকনশাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে সে দৃশ্যের কথা বলতেও পারব না, তবে এ সোফায় বসে কিছু এসে যায় না।
এক কী দুই সেকেন্ড বড় জোর। বড় জোর। ঘর জুড়ে সবে হাহাকার উঠেছে, সবাই আমার ওপর ঝুঁকে পড়েছে; ঠিক সেই সময়। ঠিক সেই সময়, ইন্দুর বুক থেকে হলুদ সবুজ পেড়ে তাঁতের আঁচল খসে গিয়েছিল। সবুজ ব্লাউজের অসতর্ক উঁকিতে বেরিয়ে এসেছিল ক্লিভেজ। ক্লিভেজের বাংলা অবিশ্যি আনন্দবাজার বলে বক্ষ-বিভাজিকা, তবে আমার মনে হয় এর ট্রান্সলেশন দাঁড়ায় না। মরার আগে সব কিছু এত ঝাপসা ছিল অথচ সোফায় বসে স্পষ্ট টের পাচ্ছি যে ওর ব্লাউজের প্রথম হুকের স্টিল-চমক থেকে বিভাজিকা নদীর শুরুতে রাখা অসংলগ্ন তিল পর্যন্ত; সমস্ত কিছু মনে স্পষ্ট গেঁথে রয়েছে। তিলে খয়েরী কম ছিল, লালচে আভা বেশি। তিলটা এতই ছোট যে আমার মাইনাস ছয় পাওয়ারের চোখের গোচরে আসা উচিৎই না। তবে এই সোফার বসে বুঝতে পারছি চোখের নাগাল পাওয়া অপথ্যালমোলজিস্টের কম্ম নয়।

কী? ইন্দু আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট? আমার নিজের পিসির মেয়ে? অফ কোর্স। আমি জানি। স্পষ্ট জানি। জীবনে এক ইঞ্চি গড়বড়ে চিন্তাও ইন্দুর হয়ে মনে ঢুকে পড়েনি কোনদিন। আমি নিশ্চিত।

হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত। আর নয়তো এ সোফায় বসে নিজের সঙ্গে তর্ক জুড়ব নাকি? যত্তসব। ইট ইজ জাস্ট আ সিচুয়েশন। জাস্ট আ সিচুয়েশন। 

যাকগে। হাতে সময় কম। এখন জীবনটাকে একটু গুটিয়ে দেখে নিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার দরকার।

বিহারের কটিহারে রেলের কোয়ার্টারে বাবার চাকরী সূত্রে কিছুদিন ছিলাম। লাল দেওয়ালের বাড়ি। বড় সুন্দর ছিল সমস্ত কিছু। ইন্দুর বুকের তিলটাও লালচে, বড় সুন্দর।
এই। এই হচ্ছে গণ্ডগোল। কটিহার ভাবতে গিয়েই ভুলটা করলাম। ননসেন্স। এদিকে সময় কম। মরণোত্তর স্বপ্ন যে এখনও শুরুই করতে পারলাম না।

দাদু। দাদুর কথা ভাবা দরকার। মানুষটা কত ভালো কোয়ালিটি আমার মধ্যে ইঞ্জেক্ট করে গিয়েছিলেন। নিজে ছিলেন সৎ পরিশ্রমী স্কুল মাস্টার। আমার মধ্যে গল্পের বইয়ের নেশা তো উনিই ঢুকিয়েছেন। ঋষি-সুলভ সারল্য তাঁর চেহারায় সর্বক্ষণ লেগে থাকত। তাঁকে চিরকাল দেখেছি ধবধবে সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতিতে। এমনকি দাদুর মাথার চুলও ধবধবে সাদা ছিল, অন্তত আমি যবে থেকে দেখছি তাঁকে। ইন্টারেস্টিংলি, ইন্দু আজ এতটাই অসাবধান ছিল যে সাদা ব্রায়ের স্ট্র্যাপ যে ব্লাউজ ছাপিয়ে সামান্য বেরিয়েছিল সেটাও খেয়াল করেনি।
ধুস।
ডিসগাস্টিং। না, না। অপরাধ বোধ নয়। আমি বদ নই, আমার কাছে ইন্দু কত স্নেহের। কিন্তু সময় এত কম। কত কিছু ভাবার রয়েছে। কত ছুঁয়ে যাওয়া সব স্মৃতি। সে’সব স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখারেই তো শেষ সুযোগ এ'টা। কত গনগনে দুঃখের দুপুর সহ্য করতে হয়েছে।

সেই যে দুপুর। আমার উচ্চমাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা। মা পাটনার হসপিটালে মারা গেলেন। মনে হয়েছিল সমস্ত ভেসে যাবে। সমস্ত আলগা হয়ে যাবে। বাবাকে দেখে মনে হয়েছিল আমার চেয়ে উনি বেশি অসহায় বোধ করছেন। মাকে যখন ওয়ার্ড থেকে বের করে হসপিটালের উঠোনে শোয়ানো হল, তখন মনে হয়েছিল বুকের ভিতর কেউ যেন গরম আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে। হসপিটাল বাড়ির সেই হলুদ দেওয়ালের বিভীষিকা আজও মনে তাজা। অথচ ইন্দুর খসে পড়া তাঁতের আঁচলের হলুদে সামান্য ভয়ও ছিল না; ছিল সাবলীল এক মায়া। যে মায়াকে বুকে টেনে নিতে হয়, কিন্তু বাঁধতে নেই।
বোঝ। বোঝ। বোঝ কাণ্ড। 

এহ! এবারে আমার রীতিমত খারাপ লাগছে। রীতিমত। হাতে আর সময় নেই। বিলকুল নেই। একদমই নেই।  ঘেন্না হচ্ছে নিজের গোঁয়ার্তুমির জন্য। ইন্দুর বুক থেকে আঁচল খসে পড়াটাই যেন সব! ষোল বছর বয়েসে ভনতওয়াং ঝর্না দেখাতে নিয়ে গেছিল ছোটমামা। ছোটমামা তখন মিজোরামে ফরেস্ট অফিসার। আহ! সে কী দৃশ্য। দু’পাশে সবুজে সবুজ চিরে নেমে আসছে চঞ্চলা, যেন তার মায়ায় ভেসে যাওয়াটাই জীবনের লক্ষ। দু’দিকের পাহাড়কে স্তিমিত করে গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঝর্নার মাতানো গতি। ইন্দুর বুকের খাঁজও বেহিসাবি ভনতওয়াংয়ের মত অতলে টেনে নিচ্ছে যেটুকু যা মনে আছে, দু’পাশে অনাবিল আকাশচুম্বী স্তব্ধতা। তন্বী বলতে অভিধান যা বোঝে, ইন্দু তার চেয়ে সামান্য বেশিই স্পষ্ট।

ঠিক সে মুহূর্তেই সোফা থেকে গড়িয়ে পড়তে হল। টের পেলাম। সোফাটা আর নেই। তার জায়গায় এসে গিয়েছে একটা প্রকাণ্ড স্টিলের ব্লাউজের হুক। প্রকাণ্ড।

সাবকনশাসে বমি করার রেওয়াজ বোধ হয় নেই। তবে একটা ঝড় এসে সাদা আলোর ফোকাসটাকে তছনছ করে ফেলেছে দেখছি।

যাক, স্বপ্নের টালবাহানাটাকে পাশ কাটানো গেল। লাল দেওয়াল ততক্ষণে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।