Skip to main content

ব্যালেন্স

- সুমিতদা! 

- হাঁপাচ্ছিস কেন?

- মিস্টার লাহিড়ীর ব্যাপারটা শুনেছেন?

- বস আগে। এক গেলাস জল খা। তারপর না হয়...।

- সুমিতদা...বসার সময় কোথায়? লাহিড়ীর কেসটা তো অনন্তপুর থানার আন্ডারে।  এখন বেরোলেও পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। আপনার ড্রাইভার আজ এসেছে নাকি ট্যাক্সি ডাকব?

- অরিন্দম। বড্ড উত্তেজিত হয়ে আছিস। নিমাইদাকে বলেছি দু'টো চা দিতে৷ লাঞ্চ করেছিস তো?

- লাঞ্চের আর সময় পেলাম কই৷ অনলাইনে খবরটা ফ্ল্যাশ হতেই ছুট দিলাম..।

- আমারও লাঞ্চ করা হয়নি। চা'টা খেয়ে নে। তারপর নিমাইদাকে বলছি ছুটে গিয়ে দু'টো রোল নিয়ে আসবে।

- সুমিতদা..আমাদের হাতে অত সময় নেই...আপনি খবরটা শুনেছেন তো?

- পুলিশ লাহিড়ীর এগেন্সটে কেস নিয়েছে৷ বিভিন্ন পলিটিকাল কাঠি নেড়েও মাফিয়া লাহিড়ী পুলিশকে ঠুঁটোজগন্নাথ করে রাখতে পারেনি। আর হ্যাঁ, এই বয়সেও অবিনাশ মিত্তিরের পার্সিভারেন্সের জবাব নেই। ওই একটা সাতপুরনো আধভাঙা বাড়ি আঁকড়ে থেকে বুড়ো যা ফাইট দিল..ব্রাভো। থ্রেট, ইন্টিমিডেশনে থেমে না থেকে, নিজের গুণ্ডাও লেলিয়েছিল লাহিড়ী৷ কিন্তু তবুও বুড়োকে টলিয়ে বাড়িটা খালি করাতে পারল না।  ওই গুণ্ডাবাহিনীর জোরে লাহিড়ী তো কম পুকুর বোজালো না, অথচ এই অবিনাশ মিত্তির ব্যাটাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ল।

- খবরটা তা'হলে ঠিকঠাকই পৌঁছেছে আপনার কাছে৷ সুমিতদা... অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে গত বছর চারেক তো আপনি নিরন্তর ওই লাহিড়ীর মত জমিখেকো মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন৷ সুরজমল, মনোহর সিং, অজয় সান্যালদের মুখোশ খুলে ফেলার পিছনে আপনার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে'টা গোটা শহর জানে। মিডিয়া বলুন, পুলিশ বলুন; আপনাকে সবাই যা ভক্তিশ্রদ্ধা করে...। লাহিড়ীর আগের কুকীর্তিগুলো সম্বন্ধে আপনার কাছে যা তথ্যপ্রমাণ, তা যদি এই সময় পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তা'হলে...।

- তা'হলে কী হবে অরিন্দম?

- বৃদ্ধ অবিনাশবাবুর অন্তত একটু উপকার হয়৷ তাছাড়া লাহিড়ী পুলিশের জাল থেকে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টাটুকু তো করবেই। কিন্তু আপনার মত একজন অ্যাকটিভিস্ট যদি..। সুমিতদা, আমাদের কিন্তু আর দেরী না করে..।

- কিছুক্ষণ আগেই লাহিড়ী আমায় ফোন করেছিল।

- লাহিড়ী? আপনাকে?

- নিজের সব দোষ মোটামুটি স্বীকার করেছে। 

- আরিব্বাস। স্বীকার করেছে?

- সব। এও আশ্বাস দিয়েছে যে অবিনাশ মিত্রের বাড়ির ওপর ওর আর কোনও লোভ নেই। আমিও সে সুযোগে দু'টো কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছি। ওর এই গুণ্ডাদলের দৌরাত্ম্য যে সুস্থসমাজে অচল, সে'টা ওর মুখের ওপর বলাটা জরুরী ছিল। 

- স্বীকার যখন করেইছে তখন তো আর চিন্তার কিছুই নেই। এ'বার সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে...।

- অরিন্দম। আমি লাহিড়ীকে কথা দিয়েছি, এ ব্যাপারে আমি আর পুলিশের কাছে যাব না। আর ব্যাপারটা তো মিটেই গেছে।

- কথা দিয়েছেন সুমিতদা? লাহিড়ীকে?

- এই অবিনাশ মিত্তির ভদ্রলোকও খুব একটা সুবিধের নয় রে অরিন্দম। টাকাপয়সার ব্যাপারে ভদ্রলোক তেমন বিশ্বাসযোগ্য বোধ হয় নন। নেহাত বৃদ্ধ, একলা মানুষ...তাই সিমপ্যাথি ব্যাপারটা চলে আসছে..।

- সুমিতদা! অবিনাশ মিত্তিরের যতই দোষ থাক। লাহিড়ীর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।  গুণ্ডা লেলিয়ে যে মানুষ প্রমোটারি চালায়..।

- সে অপরাধের শাস্তি পাওয়া অবশ্যই উচিৎ।  কিন্তু অরিন্দম, আমি পুলিশও নই, গভর্নমেন্টও নই। শহরের সমস্ত বজ্জাত প্রমোটারকে শাস্তি দেওয়ার দায় শুধু আমি একা বয়ে বেড়াব, এর কোনও মানে নেই।

- সমস্ত জেনে হাত গুটিয়ে বসে থাকা মানে তো ওর গুণ্ডার দলেই নাম লেখানো সুমিতদা। আপনার থেকে তো এই শিক্ষা পাইনি।

- অবিনাশ মিত্তির দিব্যি প্রপার্টি বগলে ড্যাংড্যাং করে বেরিয়ে যাবে। আর আমি খামোখা লাহিড়ীর গুণ্ডাদের হাতে হ্যারাসড হব কেন বলতে পারিস? সমস্ত লড়াই ব্যক্তিগত হয়ে পড়লে মুশকিল। সততার ইগোই শেষ কথা নয়, মাঝেমধ্যে ব্যালেন্স খুঁজে নিতে হয় অরিন্দম। 

- ইগো? আইডিয়াল বলুন। 

- আমি আর তর্ক করতে চাইনা। তুই চাইলে যেতে পারিস।

- প্রয়োজনে তাই যাব সুমিতদা৷ কিন্তু আমার যাওয়া আর আপনার যাওয়ার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। 

- আমাদের মধ্যে এই যে আকাশপাতাল ফারক, সে'টা শুধু বয়সের তফাৎ নয় অরিন্দম। ওই যে বললাম, আমার মধ্যে সততার ইগো নেই তাই আমি এদ্দূর আসতে পেরেছি। তাই লাহিড়ীর মত একটা রাস্কেলও আমায় ফোন করে কান্নাকাটি করে; কারণ ও জানে যে সুমিত দত্তর মতামতের একটা ওজন আছে। সুমিত দত্ত কিছু বললে সে'টা পুলিশ বা মিডিয়া সমীহ করবে। আইডিয়াল এক জিনিস, কিন্তু তা নিয়ে গোয়ার্তুমি আমি বরদাস্ত করতে পারিনা। নিজের এই ইগো ঝেড়ে ফেলতে যদি না পারিস, তা'হলে আমার মত কারুর সেক্রেটারি হয়েই জীবন কাটাতে হবে। যাকগে। আবারও বলছি, নিজেথানায় যেতে চাইলে যেতে পারিস।  তবে সে'খানে গেলে আর আমার অফিসে ফিরে আসবার কোনও প্রয়োজন নেই। কথাটা মনে রাখিস। 

****

- গুম মেরে আর কতক্ষণ বসে থাকবি অরিন্দম? চা'টা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর থানায় যেতে হলে বেরো এখন, দেরী করে লাভ কী। 

- নিমাইদাকে বরং রোলের বদলে চাউমিন আর চিলি চিকেন আনতে বলো সুমিতদা। সেই কোন সকালে দু'টো রুটি খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, খিদেয় পেটের নাড়িভুঁড়ি দলা পাকিয়ে যেতে বসেছে। 

Comments

Popular posts from this blog

গোয়েন্দা গল্প

- কিছু মনে করবেন না মিস্টার দত্ত...আপনার কথাবার্তাগুলো আর কিছুতেই সিরিয়াসলি নেওয়া যাচ্ছে না।  - কেন? কেন বলুন তো ইন্সপেক্টর? - ভোররাতে এই থানা থেকে একশো ফুট দূরত্বে ফুটপাথে আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।  - আপনার কনস্টেবল নিজের চোখে দেখেছে তো।  - না না, সে'টাকে আমি কোশ্চেন করছি না। আমি শুধু সামারাইজ করছি। আপনার গায়ে দামী চিকনের পাঞ্জাবী, ঘড়িটার ডায়ালও সোনার হলে অবাক হব না। এ'রকম কাউকে বড় একটা ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। যা হোক। হরিমোহন কনস্টেবলের কাঁধে ভর দিয়ে আপনি থানায় এলেন। জলটল খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেন। অল ইজ ওয়েল। নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের সামান্যতম ট্রেসও নেই। শরীরে নেই কোনও চোট আঘাত।  - আমার কথা আমায় বলে কী লাভ হচ্ছে? আমি যে জরুরী ব্যাপারটা জানাতে মাঝরাতে ছুটে এসেছিলাম...সেই ব্যাপারটা দেখুন...। ব্যাপারটা আর্জেন্ট ইন্সপেক্টর মিশ্র।  - আর্জেন্সিতে পরে আসছি। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আপনি থানায় ছুটে এসেছিলেন। ওয়েল অ্যান্ড গুড। কিন্তু...ফুটপাথে পড়ে রইলেন কেন...।  - এ'টাই, এ'টাই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। মাথাটাথা ঘুরে গেছিল হয়ত। আফটার অল বা

পকেটমার রবীন্দ্রনাথ

১ । চাপা উত্তেজনায় রবীন্দ্রনাথের ভিতরটা এক্কেবারে ছটফট করছিল । তার হাতে ঝোলানো কালো পলিথিনের প্যাকেটে যে ' টা আছে , সে ' টা ভেবেই নোলা ছুকছাক আর বুক ধড়ফড় । এমনিতে আলুথালু গতিতে সে হেঁটে অভ্যস্ত । তাড়াহুড়ো তার ধাতে সয় না মোটে । কিন্তু আজ ব্যাপারটা আলাদা । সে মাংস নিয়ে ফিরছে । হোক না মোটে আড়াই ' শ গ্রাম , তবু , কচি পাঁঠা বলে কথা । সহৃদয় আলম মিয়াঁ উপরি এক টুকরো মেটেও দিয়ে দিয়েছে । তোফা ! নিজের লম্বা দাড়ি দুলিয়ে ডবল গতিতে পা চালিয়ে সে এগোচ্ছিল ।   গলির মোড়ের দিকে এসে পৌঁছতে রবীন্দ্রনাথের কেমন যেন একটু সন্দেহ হল । ঠিক যেন কেউ পিছু নিয়েছে । দু ' একবার ঘাড় ঘুরিয়েও অবশ্য কাউকে দেখা গেলনা । ভাবনা ঝেড়ে ফেলে মাংসের পাকেটটায় মন ফিরিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ । বৌ নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে আজ । খোকাটাকে যে কদ্দিন মাংসের ঝোল খাওয়ানো হয়নি ।   খাসির রান্নার গন্ধ ভেবে বড় গান পাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের । সে বাধ্য হয়েই একটা কুমার শানুর গাওয়া আশিকি সিনেমার গান ধরলে ।

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে

- মিস্টার চ্যাটার্জী...। - কে? - আমার নাম বিনোদ। - আমি তো আপনাকে ঠিক...। - আমায় বস পাঠিয়েছেন। - ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...। - বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব। - আসুন, ভিতরে আসুন। - আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে। - যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না? - এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। - প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই। - কী দরকার বলুন জামা পালটে। - দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন। - ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। - ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...। - মিতু