Skip to main content

সৈন্যদল

- ক্যাপ্টেন! 
- হুঁ।
- শুনছেন? দামামা বেজে গেছে। ডাক এসেছে। 
- হুঁ। 
- কী ব্যাপার ক্যাপ্টেন? এ মুহূর্তে এমন বিষণ্ণতা আপনাকে মানায়? সবার আগে ছুটে যাবেন আপনি। আপনার দেখা পথে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা সকলে। 
- বিষণ্ণ নই, তবে এদ্দিন একসঙ্গে ছিলাম। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যূহ রচনা করেছি। প্রস্তুত হয়েছি এ মুহূর্তটার জন্যেই। কিন্তু আমার সহস্র কমরেড আজ নিজেদের বিলিয়ে দেবেন, সে'টা ভেবে মন সামান্য হলেও তো কেঁপে উঠবেই। 
- বিলিয়ে দেওয়া বটে, কিন্তু ভেসে যাওয়া তো নয় ক্যাপ্টেন। কত প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাদের। কত স্বপ্ন, কত সবুজ। 
- আমরাই সর্বনাশও বয়ে আনতে পারি কমরেড। 
- পারি। কিন্তু আমাদের পুনর্জন্মও যে অবিচল সত্য ক্যাপ্টেন। সমস্ত সর্বনাশ মুছে ফেলে আমরাই আবার না হয় ফিরে আসব নজরুল হয়ে। 
- আমি ক্যাপ্টেন হতে পারি, কিন্তু তুমি আমায় সেই শুরুর মুহূর্ত থেকে তুমিই আগলে রেখেছ কমরেড। 
- আমি সৈনিক মাত্র ক্যাপ্টেন। অধিনায়কের পাশে থাকা, এ'টুকুই তো। 
- মনে পড়ে কমরেড, সেই শুরুর দিনটা? যেদিন শুধু আমি আর তুমি মিলে বুনতে শুরু করেছিলাম এই স্বপ্নটাকে? তারপর সহস্র সঙ্গী এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো, ক্রমে আমরা দিগন্ত ঢেকে ফেললাম। এখন কত দুঃসাহসের স্বপ্ন নিয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। অথচ প্রথম দিনটা কথা মনে করলে মনে হয় কী ক্ষুদ্র, কী প্রয়োজনীয় ছিলাম আমরা। 
- অথচ আজ দেখুন, আমরা পালটে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আর দেরী নয়, দামামার শব্দ বেড়ে চলেছে। এ'বার ঝাঁপ না দিলেই নয়। আপনি পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন ক্যাপ্টেন, আপনার দল আপনার নির্দেশ মত ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত!
- বেশ। কমরেড, তুমি আমার সেনাপতি। ম্যাপটা ভালো করে দেখে নাও, বাকিদের তোমাকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। আমরা আছি ঠিক এইখানে। গত আড়াই মাস ভাসতে ভাসতে আমরা আকাশের কাঙ্ক্ষিত সেই বিন্দুতে এসে পৌঁছতে পেরেছি। আমাদের ঠিক নিচেই রয়েছে ছাদ, পুরনো শহরের ঘিঞ্জি গলির ভাঙাচোরা বাড়িটার স্যাতলা গন্ধওলা ছাদ। 
- ক্ষেত নয়, জঙ্গলের সবুজ নয়, ঝর্নার আলোড়ন নয়, বড় রাস্তার গরম ধোয়ানো উচ্ছ্বাস নয়, শেষ পর্যন্ত এই পুরনো ছাদ? ক্যাপ্টেন?
-  মনে নেই কমরেড? আমরা চেয়েছিলাম মিরাকেল হয়ে ঝরে পড়তে? আজ সেই মিরাকেল হতে পারার সুযোগ। আমার প্রতি বিশ্বাস আছে তো? 
- ক্যাপ্টেন! আপনার মেঘ প্রস্তুত। 

**

এ ছাদের গন্ধে বুক ভার হয়ে আসে। বৃষ্টির আভাস মাখানো হাওয়া ছাদ জুড়ে, ছাতের শ্যাওলা এ সময়টায় সুবাসিত হয়ে ওঠে। 

ছলছলটা ছুঁতে পারে দীপু। 

রাতের মধ্যে বিকেলের আনচানটা ফিরে আসে ফস্‌ করে। 
ঝিলের ও'পাশে সবুজে সবুজ, এ'পাশে দীপু। অশ্বত্থ গাছটার নীচে কে যেন দেবতা ঠাহর করে পাথর ফেলে গেছে, তার পাশে মরা ধূপ।  সে সুখা  বিকেলে বৃষ্টি গন্ধ এনে দিয়ে কেউ ঠক্‌ করে প্রশ্ন করেছিল;

"তুই সজনে গাছ চিনিস না? ছিঃ! এই দ্যাখ"। 

আজ এই বেঢপ মাঝরাতের ছাদে সে বিকেলের ছলছল গন্ধ, ছুঁতে পারে দীপু। 

প্রথম ফোঁটাটা ফতুয়ার বুক পকেটে টপাত মাইক্রোঢেউ হয়ে মিলিয়ে যেতেই টের পাওয়া যায় বিকেল জড়িয়ে ধরছে মাঝরাতকে। 

সেই সজনে গাছে। 

ওই প্রথম ফোঁটা বুক ছোঁয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেমক্কা ভেজা  বছরের প্রথম বৃষ্টি, বিকেলের গন্ধ আর সজনে গাছে। দীপু অবশ্য শুনতে পেলো না ওঁর বুকপকেট থেকে ভেসে আসা অস্ফুট উচ্ছ্বাসটুকু ;
"ডিয়ার কমরেডস, আমরা পেরেছি! পেরেছি! ইট্‌স আ মিরাকেল"। 

Comments

Popular posts from this blog

গোয়েন্দা গল্প

- কিছু মনে করবেন না মিস্টার দত্ত...আপনার কথাবার্তাগুলো আর কিছুতেই সিরিয়াসলি নেওয়া যাচ্ছে না।  - কেন? কেন বলুন তো ইন্সপেক্টর? - ভোররাতে এই থানা থেকে একশো ফুট দূরত্বে ফুটপাথে আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।  - আপনার কনস্টেবল নিজের চোখে দেখেছে তো।  - না না, সে'টাকে আমি কোশ্চেন করছি না। আমি শুধু সামারাইজ করছি। আপনার গায়ে দামী চিকনের পাঞ্জাবী, ঘড়িটার ডায়ালও সোনার হলে অবাক হব না। এ'রকম কাউকে বড় একটা ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। যা হোক। হরিমোহন কনস্টেবলের কাঁধে ভর দিয়ে আপনি থানায় এলেন। জলটল খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেন। অল ইজ ওয়েল। নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের সামান্যতম ট্রেসও নেই। শরীরে নেই কোনও চোট আঘাত।  - আমার কথা আমায় বলে কী লাভ হচ্ছে? আমি যে জরুরী ব্যাপারটা জানাতে মাঝরাতে ছুটে এসেছিলাম...সেই ব্যাপারটা দেখুন...। ব্যাপারটা আর্জেন্ট ইন্সপেক্টর মিশ্র।  - আর্জেন্সিতে পরে আসছি। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আপনি থানায় ছুটে এসেছিলেন। ওয়েল অ্যান্ড গুড। কিন্তু...ফুটপাথে পড়ে রইলেন কেন...।  - এ'টাই, এ'টাই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। মাথাটাথা ঘুরে গেছিল হয়ত। আফটার অল বা

ব্লগ-বাজ

আর চিন্তা নেই । বাঙালিকে আর রোখা যাবে না । আর সামান্য (সম্ভবত কিঞ্চিত গোলমেলে ) কবিতা ছাপাবার জন্যে সম্পাদক কে তোল্লাই দিতে হবে না । আর প্রেমে লটরপটর হয়ে ডায়েরি লিখে প্রাণপাত করতে হবে না। পলিটিক্স কে পাবলিক-জন্ডিস বলে গাল দেওয়ার জন্য আর “প্রিয় সম্পাদক” বলে আনন্দবাজারের ঠ্যাং ধরতে হবে না। কেন ?  হোয়াই? বাঙালি ব্লগিং শিখে গ্যাছে যে। ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে শাণিত তলোয়ারের মত “ পোস্ট”-সমূহ জনতার ইন্টেলেক্ট এসপার-ওসপার করে দেবে ; হাতে-গরম গায়ে-কাঁটা। বাঙালি মননের নব্য জিস্পট ; ব্লগ-স্পট । কে বলে যে বাঙালি ব্রিগেডে বুক্তুনি দিয়ে আর ফুটবল মাঠে খেউড় করে খতম হয়ে গ্যাছে ? কে বলে যে বাঙালির ঘিলু কফি হাউসে ভাত ঘুমে মগ্ন ? বাঙালিকে একবার ব্লগখোর হতে দিন , সমস্ত অভিযোগ ভ্যানিশ হয়ে যাবে । পোপ থেকে পরশুরাম ; ডেঙ্গু থেকে মশাগ্রাম ; বং-ব্লগের দাপট রইবে সর্বত্র । বাঙালির সমস্ত আশা-ভরসা-জিজ্ঞাসা এইবারে ব্লগ মারফত্‍ পৌছে যাবে ট্যাংরা ট্যু টেক্সাস । তোপসে মাছের স্প্যানিশ ঝোলের রেসিপি কী ? বাঙাল-ঘটি মিল মহব্বত-হয়ে গেলে কি বাঙ্গালিয়ানা চটকে যাবে ? নেতাজী কি এখ

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে

- মিস্টার চ্যাটার্জী...। - কে? - আমার নাম বিনোদ। - আমি তো আপনাকে ঠিক...। - আমায় বস পাঠিয়েছেন। - ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...। - বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব। - আসুন, ভিতরে আসুন। - আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে। - যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না? - এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। - প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই। - কী দরকার বলুন জামা পালটে। - দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন। - ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। - ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...। - মিতু