Thursday, April 20, 2017

সৈন্যদল

- ক্যাপ্টেন! 
- হুঁ।
- শুনছেন? দামামা বেজে গেছে। ডাক এসেছে। 
- হুঁ। 
- কী ব্যাপার ক্যাপ্টেন? এ মুহূর্তে এমন বিষণ্ণতা আপনাকে মানায়? সবার আগে ছুটে যাবেন আপনি। আপনার দেখা পথে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা সকলে। 
- বিষণ্ণ নই, তবে এদ্দিন একসঙ্গে ছিলাম। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যূহ রচনা করেছি। প্রস্তুত হয়েছি এ মুহূর্তটার জন্যেই। কিন্তু আমার সহস্র কমরেড আজ নিজেদের বিলিয়ে দেবেন, সে'টা ভেবে মন সামান্য হলেও তো কেঁপে উঠবেই। 
- বিলিয়ে দেওয়া বটে, কিন্তু ভেসে যাওয়া তো নয় ক্যাপ্টেন। কত প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাদের। কত স্বপ্ন, কত সবুজ। 
- আমরাই সর্বনাশও বয়ে আনতে পারি কমরেড। 
- পারি। কিন্তু আমাদের পুনর্জন্মও যে অবিচল সত্য ক্যাপ্টেন। সমস্ত সর্বনাশ মুছে ফেলে আমরাই আবার না হয় ফিরে আসব নজরুল হয়ে। 
- আমি ক্যাপ্টেন হতে পারি, কিন্তু তুমি আমায় সেই শুরুর মুহূর্ত থেকে তুমিই আগলে রেখেছ কমরেড। 
- আমি সৈনিক মাত্র ক্যাপ্টেন। অধিনায়কের পাশে থাকা, এ'টুকুই তো। 
- মনে পড়ে কমরেড, সেই শুরুর দিনটা? যেদিন শুধু আমি আর তুমি মিলে বুনতে শুরু করেছিলাম এই স্বপ্নটাকে? তারপর সহস্র সঙ্গী এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো, ক্রমে আমরা দিগন্ত ঢেকে ফেললাম। এখন কত দুঃসাহসের স্বপ্ন নিয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। অথচ প্রথম দিনটা কথা মনে করলে মনে হয় কী ক্ষুদ্র, কী প্রয়োজনীয় ছিলাম আমরা। 
- অথচ আজ দেখুন, আমরা পালটে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আর দেরী নয়, দামামার শব্দ বেড়ে চলেছে। এ'বার ঝাঁপ না দিলেই নয়। আপনি পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন ক্যাপ্টেন, আপনার দল আপনার নির্দেশ মত ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত!
- বেশ। কমরেড, তুমি আমার সেনাপতি। ম্যাপটা ভালো করে দেখে নাও, বাকিদের তোমাকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। আমরা আছি ঠিক এইখানে। গত আড়াই মাস ভাসতে ভাসতে আমরা আকাশের কাঙ্ক্ষিত সেই বিন্দুতে এসে পৌঁছতে পেরেছি। আমাদের ঠিক নিচেই রয়েছে ছাদ, পুরনো শহরের ঘিঞ্জি গলির ভাঙাচোরা বাড়িটার স্যাতলা গন্ধওলা ছাদ। 
- ক্ষেত নয়, জঙ্গলের সবুজ নয়, ঝর্নার আলোড়ন নয়, বড় রাস্তার গরম ধোয়ানো উচ্ছ্বাস নয়, শেষ পর্যন্ত এই পুরনো ছাদ? ক্যাপ্টেন?
-  মনে নেই কমরেড? আমরা চেয়েছিলাম মিরাকেল হয়ে ঝরে পড়তে? আজ সেই মিরাকেল হতে পারার সুযোগ। আমার প্রতি বিশ্বাস আছে তো? 
- ক্যাপ্টেন! আপনার মেঘ প্রস্তুত। 

**

এ ছাদের গন্ধে বুক ভার হয়ে আসে। বৃষ্টির আভাস মাখানো হাওয়া ছাদ জুড়ে, ছাতের শ্যাওলা এ সময়টায় সুবাসিত হয়ে ওঠে। 

ছলছলটা ছুঁতে পারে দীপু। 

রাতের মধ্যে বিকেলের আনচানটা ফিরে আসে ফস্‌ করে। 
ঝিলের ও'পাশে সবুজে সবুজ, এ'পাশে দীপু। অশ্বত্থ গাছটার নীচে কে যেন দেবতা ঠাহর করে পাথর ফেলে গেছে, তার পাশে মরা ধূপ।  সে সুখা  বিকেলে বৃষ্টি গন্ধ এনে দিয়ে কেউ ঠক্‌ করে প্রশ্ন করেছিল;

"তুই সজনে গাছ চিনিস না? ছিঃ! এই দ্যাখ"। 

আজ এই বেঢপ মাঝরাতের ছাদে সে বিকেলের ছলছল গন্ধ, ছুঁতে পারে দীপু। 

প্রথম ফোঁটাটা ফতুয়ার বুক পকেটে টপাত মাইক্রোঢেউ হয়ে মিলিয়ে যেতেই টের পাওয়া যায় বিকেল জড়িয়ে ধরছে মাঝরাতকে। 

সেই সজনে গাছে। 

ওই প্রথম ফোঁটা বুক ছোঁয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেমক্কা ভেজা  বছরের প্রথম বৃষ্টি, বিকেলের গন্ধ আর সজনে গাছে। দীপু অবশ্য শুনতে পেলো না ওঁর বুকপকেট থেকে ভেসে আসা অস্ফুট উচ্ছ্বাসটুকু ;
"ডিয়ার কমরেডস, আমরা পেরেছি! পেরেছি! ইট্‌স আ মিরাকেল"। 

No comments:

অরূপ ঘোষালের শহর

- এক্সকিউজ মি। - আপ মুঝে বুলা রহে হ্যায়? - আরে হ্যাঁ রে বাবা। আপনাকেই বুলা রহে হ্যায়। - আরে, আপনিও বাঙালি যে। - নমস্কার। সঞ্জয় ঘ...