Saturday, October 11, 2014

নিত্যযাত্রী

" কেউ ক্রিকেট খেলেন, কেউ রাইটার্সে ফাইল-বাজি করেন, কেউ গীটার বাজিয়ে আহা-উঁহু করেন, কেউ ভোটে দাঁড়ান, কেউ টিউশনি পড়ান। আমি করি ডেলি-প্যাসেঞ্জারি। ওইটাই হল আমার প্রফেশন বুঝলেন", সন্ধ্যে ছটা দশের আপ বর্ধমান লোকালে সদ্য আলাপ হওয়া দিলীপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আলাপের শুরু খবরের কাগজ আদান-প্রদান দিয়ে। দিলীপবাবুর কোথায় না হেসে পারলাম না।
- " হাসছেন দাদা ?", পকেটের রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন দিলীপবাবু, " আরে মশাই , " আমার তো মনে হয় মেমারি টু হাওড়াতেই জীবন বয়ে যাচ্ছে। সকালে দু বালতি জলে স্নান আর চাট্টি ডাল-ভাত, অফিসে দুটো ফাইল আর ওপরওয়ালার খিস্তি। ওদিকে বাড়ি ফিরে বাচ্চার ঘ্যান-ঘ্যান, গিন্নীর বায়না আর টেলিভিশনে গুলতানি। এ সব তো হুশ করে হাপিশ হয়ে যায়; কিন্তু প্রত্যেক দিন যেটা রয়ে যায় সেটা হচ্ছে সাড়ে দিন ঘণ্টার ট্রেন ঘষটানি। বুঝলেন ?"
- " বুঝলাম", বলতেই হল।
- " নো স্যার। বোঝা অত সহজ নয়। গত তেইশ বছর ধরে; ঝরে-জলে-রোদ্দুরে এই বর্ধমান লোকালের ঠিক এই কামরাটিতেই আমার দৈনিক সাড়ে তিন ঘণ্টা কাটে। এইটে হল আমার ড্রয়িং রুম; খবরের কাগজ পড়বার সোফা হচ্ছে এই কাঠের সিট। ক্লাবও বলতে পারেন- টুয়েন্টি-নাইন টু রামিও এইখানেই চলে। এইখানে আমার সোশ্যালিজম'য়ে হাতেখড়ি। কি ভাবে ? গত পনেরো বছর ধরে আমার ফিক্সড টুয়েন্টি নাইন পার্টনার হচ্ছে পল্টু- গড়িয়াহাটের মাছ-ওয়ালা। আর রামি'র পার্টনার হলে গিয়ে বড়বাজারের লোহার-কারবারি দেবকুমার দেব; হুগলী বর্ধমান মিলে যার একশো বিঘের ওপর জমি রয়েছে। তারপর ধরুন আমার ইয়ার-দোস্ত বলতে যারা সবাই ডেলি-প্যাসেঞ্জার। এই কামরাটাই আমার রক। সাহেব-সুবো'দের মত শরীর চাঙ্গা রাখতে আমায় জিমে ছুটতে হয় না; রোজকার ট্রেন-জার্নিতেই মেদ-টেদ ফস করে উড়ে যায়। আর নিজস্ব রুচি-টুচি গেছে বেদম চটকে"
- " রুচি চটকে গেছে মানে ?", গপ্প শুনতে মন্দ লাগছিলো না।
- " মানে এই ধরুন আলুর দমের থেকে সল্টেড বাদামে বেশি স্বাদ পাই। আমার শালাবাবু আসামের টী-এস্টেটের ম্যানেজার- তাঁর দৌলতে বাড়িতে হামেশাই এস্যাম টী'র ডিবে আসে। কিন্তু ট্রেনে দুলুনি বা মাটির ভাঁড় ছাড়া আমার মুখে চা রোচেনা। তা ছাড়া একটা অতি সাঙ্ঘাতিক অভ্যাসের কবলে পড়েছি মশাই"
- " কেমন সাঙ্ঘাতিক ?"
- " দাঁড়িয়ে ঘুমোবার"
- " মানে ?"
- " মানে হাওড়া যাওয়ার সময় রোজই বিদঘুটে ভিড়। বসার আশা তো দূর একপায়ে দাঁড়াতে পারলে সুবিধে হয়।তা সেই বিদঘুটে সময়টা কাটাতে আমি বিগত কুড়ি বছর ধরে ঘুমিয়ে আসছি; দাঁড়িয়ে। এক হাতে ট্রেনের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে অফিস ব্যাগ আর চোখে ঘুম। ঝক্‌ঝকে আধ ঘণ্টা।
- " বলেন কি ? রোজ?"
- " ইয়েস স্যার। ইভেন অন সানডেইজ"
- " রোববারেও? কিন্তু রবিবার তো ছুটি ?"
- " আরে মশাই, জানি। কিন্তু অভ্যাস ভারি খতরনাক্‌ চিজ। দিনে আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে না ঘুমোলে আমার সুগার বেড়ে যায়, গা গুলোতে থাকে, মাথা ঝিম্‌ঝিম্‌ করে। অতএব, রবিবারগুলোতে যাতে কোনও ক্রাইসিস্‌ না হয়, তার জন্যে চিলে কোঠার ঘরের কড়িকাঠ থেকে একটা কাঠের হ্যান্ডেল ঝুলিয়ে নিয়েছি। স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো; অবিকল এই কামরায় যেমন ঝুলন্ত হ্যান্ডেলগুলো দেখছেন; সেরকম। প্রতি রবিবার সকাল আটটা সতেরো হলেই দু বালতি জলে স্নান সেরে অফিসের ব্যাগ হাতে সোজা চলে যাই চিলেকোঠার ঘরে আর তারপর হ্যান্ডেল ধরে আধ-ঘণ্টা বেধড়ক ঘুম। ব্যাস, রবিবারে নেমে আসে অপরূপ প্রশান্তি"

তিব্বতি মাদুলি

- মনখারাপ? - আজ্ঞে। প্রচণ্ড। টেরিফিক লেভেলে মনখারাপ। - সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন? জয়েন্টে ফেল? মিনিবাসের পকেটমারিতে সত্তর টাকা জল...