Skip to main content

গিন্নী


- নরেন। নরেন!

- আরে দাসবাবু। এই ভরদুপুরে?

- বুড়োদের কি দুপুরবেলা বেরোতে নেই? তোমার ভাতঘুমে ব্যাঘাত ঘটালাম দেখছি। তা দোকান খুলে না ঝিমিয়ে,  দুপুরবেলা দোকান বন্ধ করে নাক ডাকলেই পারো তো।

- পুরনো অভ্যাস। অবশ্য মুদির দোকানে বিক্রিবাটা আজকাল কমের দিকেই। আর দুপুরে তো প্রায় কেউই..আপনাকে কী দেব?

- চা পাতা রাখো? ভালো কোয়ালিটির কিছু? বড় দোকান ছাড়া আমার প্রেফার্ড কোয়ালিটি পাওয়া দায়, কিন্তু বাড়ির কৌটো নিঃশেষ, আর্জেন্টলি কিছু না নিলে...।

- আমার কাছে আড়াইশো হাফকিলোর প্যাকেট কিছু আছে। তবে কোয়ালিটি আপনার কেমন লাগবে বলতে পারিনা। হাফডাস্ট, তেমন দামী নয়।

- আড়াইশোর একটা প্যাকেট দিও, যা ভালো মনে হয়। আর দু'শো গ্রাম গুড়ের বাতাসা।

- দিচ্ছি।

- আর শোনো, চানাচুর আছে? কড়া ঝাল কিছু?

- প্যাকেট করা না লুজ?

- ঝাল কোনটায় বেশি?

- লুজটায়। ওই যে, আপনার সামনেই যে'টা বয়ামে রাখা আছে।

- বেশ। ও'টা আধকিলো মত দিয়ে দাও।

- দাসবাবু, আজ আপনি নিজে বেরিয়েছেন জিনিসপত্র নিতে; আপনার সাগরেদটি কই?

- হরি? রাস্কেলটার নাম নিও না। ওর মুখ দেখলে আমার আজকাল জুতোপেটা করতে ইচ্ছে করছে।

- সে কিছু গোলমাল করেছে কি?

- করবে কী আবার। বাড়িতে চা পাতা ফুরিয়েছে অথচ তার কোনো হেলদোল নেই। এ'দিকে গতকাল রাত্রে কচুরশাক এমন জোলো রান্না করেছে যে মনে হচ্ছে মুখদর্শন করলে জীবন বিস্বাদ হয়ে পড়বে। অথচ দ্যাখো নরেন, হরির রান্নার হাত তো মন্দ নয়। আমার গিন্নী ওকে একদিকে যেমন ধেড়ে বয়সে প্রাণপাত করে ইংরেজি গ্রামার পড়িয়েছে, তেমনি মনপ্রাণ ঢেলে রান্না শিখিয়েছে। গিন্নী বেচারি আরো বছর তিনেক বাঁচলে হরিকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করিয়ে ছাড়ত। অথচ কোনো অ্যাপ্লিকেশন বা ফোকাস নেই ইডিয়টটার। আজ দুপুরের ছানার ডালনাতেও দেখলাম মশলা ঝোলে মেশেনি। ওকে আমি পারলে জেলে দিতাম গিন্নীর স্কুলিংকে এমন ভাবে ইনসাল্ট করার জন্য।

- অন্যায়ই বটে। তবে হরি ছেলে ভালো, আপনাকে মান্যি করে বেশ।

- থামো থামো। তোমায় আর ওর হয়ে বাটপাড়ি করতে হবে না। আর আমি ওর বেয়াদবি সহ্য করব না। গিন্নী গ্রাম থেকে একটা কালসাপ তুলে এনেছিল। হাড় জ্বালিয়ে শেষ করলে।

- এই যে আপনার জিনিসগুলো। খাতায় লিখে রাখছি। মাসের শেষে টাকা নিয়ে আসব।

- বেশ। আর শোনো, তোমার কাছে চকোলেট আছে?

- দশ কুড়ি টাকার কিছু?

- খুব ভালো কিছু?

- আমার কাছে ভালো বলতে এ'টা। ক্যাডবেরির। কিন্তু দাসবাবু, আপনার তো শুগার! এই বাতাসা আর চকোলেট...।

- ওই চকোলেট ছ'টা দাও। আর শুগার আমার শরীরে, হরি পারলে বাতাসার গুদাম চেটেপুটে সাফ করে ফেলতে পারে।

- ওহ্..।

- পরশু থেকে ওর উচ্চমাধ্যমিক।  চল্লিশ বছরের খোকা এই নিয়ে তিনবার এগজ্যাম দেবে। ছি ছি, আমার লজ্জায় মাথাকাটা যাচ্ছে। গিন্নীর নামে আর একবার গয়া গিয়ে পিণ্ডি দিতে হবে যদি আবারও ফেল করে। অপোগণ্ড। ব্ল্যাকশিপ কোথাকার। অথচ গিন্নী বলত হরিকে নাকি ও গ্র‍্যাজুয়েট করে ছাড়বে। যত বাজে কথা বলত বুড়ি।

- এই যে, চা, বাতাসা, চানাচুর আর চকোলেট।

- হরিকে আমি বলে রেখেছি। পরীক্ষার এই ক'দিন পাড়ার দোকান থেকে রুটি সবজি আনিয়ে খাবো, সে পড়ার বই ছেড়ে উঠলেই বেধড়ক লাঠিপেটা করব। তা বাদে ধরো দুপুর রোদে বেরিয়ে সর্দি লাগানো বারণ। বাতাসা হচ্ছে পড়ার সময় মুখে দিয়ে চুষবার জন্য, এনার্জাইজার; এমনিতেও গুড়ের বাতাসা হরির ছেলেবেলা থেকেই খুব প্রিয়। তাছাড়া রাতের দিকে পড়ার মাঝে ঘুম পেলে কড়া ঝাল চানাচুর হাফ-বাটি; অব্যর্থ। প্লাস প্রতি পরীক্ষার শেষে একটা গোটা চকোলেট। ফর্মুলাটা গিন্নীর; খুব এফেক্টিভ।

- তা বটে।

- ওহহো, নরেন। তোমার নজরে কোনো ভালো ছেলে আছে? আমার দেখভাল করবে, গোটাদিন সঙ্গে থাকবে। রান্নাবান্না করবে।

- হরিকে তাড়াবেন নাকি?

- হরিকে তাড়ালে গিন্নী নেমে এসে গলা টিপবে ভাই। তবে গিন্নীর বড় ইচ্ছে ছিল হরি অফিসে কাজ করবে, বাবুটি হয়ে। পাটনায় আমার এক আত্মীয়ের ফার্মে তার চাকরির ব্যবস্থা সেই কবে থেকে করা আছে, শর্ত শুধু একটাই; আগে সে ব্যাটাকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করতে হবে। কিন্তু গবেটটা বছরের পর বছর ফেল করে যাচ্ছে, কী মুশকিল বলো দেখি। তবে এইবারে বুঝলে নরেন, ওর প্রেপারেশন আমি কড়াভাবে সুপারভাইজ করেছি, আমি নিশ্চিত ও পাশ করবেই...। যাকগে, ভালো ছেলের খোঁজ পেলে জানিও, কেমন?

 ***

প্রতিবার উচ্চমাধ্যমিকের সময় এলেই বুড়োবাবুর পাগলামো বাড়ে। তবে তাঁকে নিরস্ত করতেও মন সরে না হরির।  গিন্নীমার প্ল্যান মত বাবু তাকে পাটনায় পাঠিয়ে সাহেবি কেতায় চাকরী করাতে চান, কিন্তু বুড়োকে একা রেখে গেলেও কি গিন্নীমা শান্তি পাবেন?

বাবু বাইরে বেরোলে মাঝেমধ্যে দেওয়ালে টাঙানো গিন্নীমার বিশাল ফোটোটা নামিয়ে আনে হরি। ফটোফ্রেমের পিছনে লুকনো নিজের দু'বছর আগে পাওয়া উচ্চমাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেটটা বের করে আনে সে।

সেকেন্ড ডিভিশন। গিন্নীমার বড় ইচ্ছে ছিল সে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করবে। কিন্তু কত কিছুই তো পুরোপুরি হয়না, খাপছাড়া হওয়াগুলোই বা কম কীসে। গিন্নীমার কথা মনে এলেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, আর চোখ ঝাপসা হলেই সে'দিন তার হাতের রান্নার স্বাদ পানসে হয়ে পড়বেই।

Comments

Popular posts from this blog

গোয়েন্দা গল্প

- কিছু মনে করবেন না মিস্টার দত্ত...আপনার কথাবার্তাগুলো আর কিছুতেই সিরিয়াসলি নেওয়া যাচ্ছে না।  - কেন? কেন বলুন তো ইন্সপেক্টর? - ভোররাতে এই থানা থেকে একশো ফুট দূরত্বে ফুটপাথে আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।  - আপনার কনস্টেবল নিজের চোখে দেখেছে তো।  - না না, সে'টাকে আমি কোশ্চেন করছি না। আমি শুধু সামারাইজ করছি। আপনার গায়ে দামী চিকনের পাঞ্জাবী, ঘড়িটার ডায়ালও সোনার হলে অবাক হব না। এ'রকম কাউকে বড় একটা ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। যা হোক। হরিমোহন কনস্টেবলের কাঁধে ভর দিয়ে আপনি থানায় এলেন। জলটল খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেন। অল ইজ ওয়েল। নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের সামান্যতম ট্রেসও নেই। শরীরে নেই কোনও চোট আঘাত।  - আমার কথা আমায় বলে কী লাভ হচ্ছে? আমি যে জরুরী ব্যাপারটা জানাতে মাঝরাতে ছুটে এসেছিলাম...সেই ব্যাপারটা দেখুন...। ব্যাপারটা আর্জেন্ট ইন্সপেক্টর মিশ্র।  - আর্জেন্সিতে পরে আসছি। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আপনি থানায় ছুটে এসেছিলেন। ওয়েল অ্যান্ড গুড। কিন্তু...ফুটপাথে পড়ে রইলেন কেন...।  - এ'টাই, এ'টাই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। মাথাটাথা ঘুরে গেছিল হয়ত। আফটার অল বা

পকেটমার রবীন্দ্রনাথ

১ । চাপা উত্তেজনায় রবীন্দ্রনাথের ভিতরটা এক্কেবারে ছটফট করছিল । তার হাতে ঝোলানো কালো পলিথিনের প্যাকেটে যে ' টা আছে , সে ' টা ভেবেই নোলা ছুকছাক আর বুক ধড়ফড় । এমনিতে আলুথালু গতিতে সে হেঁটে অভ্যস্ত । তাড়াহুড়ো তার ধাতে সয় না মোটে । কিন্তু আজ ব্যাপারটা আলাদা । সে মাংস নিয়ে ফিরছে । হোক না মোটে আড়াই ' শ গ্রাম , তবু , কচি পাঁঠা বলে কথা । সহৃদয় আলম মিয়াঁ উপরি এক টুকরো মেটেও দিয়ে দিয়েছে । তোফা ! নিজের লম্বা দাড়ি দুলিয়ে ডবল গতিতে পা চালিয়ে সে এগোচ্ছিল ।   গলির মোড়ের দিকে এসে পৌঁছতে রবীন্দ্রনাথের কেমন যেন একটু সন্দেহ হল । ঠিক যেন কেউ পিছু নিয়েছে । দু ' একবার ঘাড় ঘুরিয়েও অবশ্য কাউকে দেখা গেলনা । ভাবনা ঝেড়ে ফেলে মাংসের পাকেটটায় মন ফিরিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ । বৌ নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে আজ । খোকাটাকে যে কদ্দিন মাংসের ঝোল খাওয়ানো হয়নি ।   খাসির রান্নার গন্ধ ভেবে বড় গান পাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের । সে বাধ্য হয়েই একটা কুমার শানুর গাওয়া আশিকি সিনেমার গান ধরলে ।

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে

- মিস্টার চ্যাটার্জী...। - কে? - আমার নাম বিনোদ। - আমি তো আপনাকে ঠিক...। - আমায় বস পাঠিয়েছেন। - ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...। - বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব। - আসুন, ভিতরে আসুন। - আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে। - যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না? - এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। - প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই। - কী দরকার বলুন জামা পালটে। - দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন। - ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। - ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...। - মিতু