Wednesday, June 17, 2020

যুদ্ধযাত্রা


- সরাইখানায় নতুন বলে মালুম হচ্ছে?

- হুঁ।

- আমার নাম কার্লোস। বসি এ'খানে?

- আমি আন্দ্রে।

- বয়সে তো তুমি আমার খুড়োর বয়সী গো। তা, একটু না হয় আবদার নিয়েই বলি। এক গেলাস বিয়ার খাওয়াও না।

- বেশ তো..।

- বাঁচালে কার্লোস খুড়ো৷ গলা এক্কেবারে শুকিয়ে কাঠ। এই যে ভায়া, দু'টো বিয়ার এই টেবিলে।

- একটাই বলো না হয়।

- ও মা। তুমি খাবে না নাকি? 

- নাহ্।

- তা'হলে তাই হোক। তবে দু'টো বিয়ার আসছে যখন আসুক না। আমি না হয় দু'টোই...। কিন্তু ইয়ে খুড়ো...তাই বলে আমার পানপাত্রটি খালি হওয়ার আগে কেটে পড়ো না যেন। সন্ধ্যের মেজাজটি তা'তে নষ্ট হবে। 

- বেশ।

- খুড়ো, তুমি বড় অল্প কথার মানুষ দেখছি। 

- তুমি একাই তো দিব্যি আড্ডা জমিয়েছ। আমার আর বেশি কথায় কাজ কী বলো।

- শোনো খুড়ো, চুপ করে বসে থাকলে কিন্তু কিছু হবেনা। এ'বার গর্জে না উঠলেই নয়।

- গর্জন?

- গর্জন। এক্কেবারে হালুম। দেশের ঘাড়ে যুদ্ধ এসে পড়েছে আর আমরা মিউমিউ করব; এ'টা তো মেনে নেওয়া যায়না খুড়ো। 

- তা তো বটেই।

- যাক, বিয়ার এসেছে। 

- গলা শুকিয়ে গেছে বলছিলে। চুমুক দাও।

- চিয়ার্স। আহ্। বুঝলে খুড়ো, এ'বার কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

- ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? কাদের ওপর?

- ও মা! হাড়হারামি দেশ সিলডাভিয়া আমাদের আক্রমণ করে বসল। এ'বার আমাদের প্রত্যেককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পড়তে হবেই। কুত্তার বাচ্চা সিলিডাভিয়ানদের দেখলেই কচুকাটা করতে হবে।

- দেশের হয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে পারে, এমন নাগরিকই তো  দরকার।

- দেশের ওপর এমন আক্রমণ হচ্ছে ভাবলেই চোখ ভিজে আসে গো খুড়ো। এই আমার চোখের দিকে চেয়ে দ্যাখো! দ্যাখো। বুঝছ দুঃখটা?

- আহা আন্দ্রে। সত্যিই কেঁদে ফেলবে নাকি?

- কাঁদব না কেন খুড়ো? কেঁদে ভাসাব না কেন? দেশের ওপর এমন অন্যায় আঘাত হানার আগে শুয়োরের বাচ্চা সিলডাভিয়ানগুলো আমায় গুলি করে মেরে ফেললো না কেন।

- গুলি? খেতে চাইছ?

- মরতে ভয় পাই ভেবেছ খুড়ো? দেশের জন্য অমন কয়েক হাজার গুলি খাওয়ার যন্ত্রণা আমি হেসে হজম করতে পারব। 

- বাহ্।

- বুঝলে খুড়ো। দেশের চেয়ে বড় কিছু হয়না। কবিরা কি সাধে বলেছেন যে দেশ আদতে যে নিজের মায়েরই মত। তার ওপর এমন অশ্লীল আক্রমণ..আমি সন্তান হয়ে মেনে নেব কী করে?.

- হ্যাঁ। যুদ্ধের অবস্থা বেশ ভয়াবহ।

- কিন্তু তুমি দেখো খুড়ো, আমরা জিতবই। প্রয়োজনে আমার এই লাঠিটা নিয়ে সীমানায় গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেব। সিলডাভিয়ানদের তলোয়ারের ঘায়ে প্রাণ দিতে হলে দেব। দেশের জন্য দেব।

- দেবে বৈকি।

- জানো আমি কী চাই খুড়ো?

- কী চাও আন্দ্রে?

- আমি চাই আমাদের সৈন্যরা সীমান্তে আটক না।থেকে সিলডাভিয়ায় ঢুকে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিক। তা'হলেই হারামজাদারা বুঝুবে কত ধানে কত চাল..।

- ও'দের বোঝানো দরকার,তাই না?

- আলবাত দরকার। আর এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিৎ রাজামশাইয়ের কাছে আবেদন করা যাতে সিলডাভিয়াকে এইবেলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

- যুদ্ধ তো সিলডাভিয়াও করবে।

- আমরা কি যুদ্ধকে ডরাই ভেবেছ খুড়ো? আমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে...টগবগ করে!

- যাবে? যুদ্ধে?

- আমায় কিছু বললে নাকি খুড়ো? বড় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম...ঠিক শুনতে পাইনি।

- যুদ্ধে যাবে?

- যুদ্ধে? সীমান্তে?

- কাল সকালেই আমায় সীমান্তের দিকে যেতে হবে। সে'খানকার সেনাছাউনিতে একটা জরুরী কাজ আছে। তোমার মত জোয়ান ছোকরাকে সহজেই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে নেবে কিন্তু আন্দ্রে। যাবে আমার সঙ্গে?

- ইয়ে, যাওয়ার তো বড় ইচ্ছে। বড় ইচ্ছে। কিন্তু..।

- কিন্তু?

- আমার একটা মুদীর দোকান আছে হে খুড়ো৷ দেশের জন্য যতই বুক ফেটে যাক; দোকানটা বন্ধ রাখা একদমই উচিৎ হবে না। তাছাড়া সবাই ড্যাংড্যাং করে যুদ্ধ করতে গেলেই তো হবে না, অর্থনীতির ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে।

- এই অসময়ে, তোমার মত গুণী মানুষরা যদি সীমানায় গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় আন্দ্রে...তবেই তো দেশের ও দশের সাহস বাড়বে।

- বটেই তো বটেই তো। তবে ইয়ে খুড়ো, আমার না আবার ছোটবেলা থেকেই একটু সর্দির ধাত আছে৷ খোলা হাওয়া বুকে লাগলেই কফ বসে সে এক একাকার কাণ্ড৷ তাছাড়া মা আচার শুকোতে দিচ্ছে রোজ দুপুরে, সেই আচারের পাত্রগুলো বিকেলবেলার দিকে ঘরে ঢোকানোর দায়িত্বও আমার। বাড়িছাড়া হলে মা যা বকুনি দেবে না খুড়ো...এক্কেবারে খতরনাক মহিলা।

- বেশ।

- তা খুড়ো, সেনাছাউনিতে আবার তোমার কী কাজ?

- আমার একমাত্র পুত্র আলেকজান্ডার। সে গতকাল আমাদের সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যায়। খোকার দেহটাকে নিয়ে বাড়ি ফেরা দরকার, তার মা পথ চেয়ে বসে রয়েছে যে।

No comments:

লক্ষ্মী

- কে? বিমল? - হ্যাঁ ভজাদা। - বাইরে দাঁড়িয়ে কেন। ভেতরে আয়। - না, মানে..ঠিক বলেকয়ে আসার সুযোগ পাইনি তো।  তুমি মক্কেলদের নিয়ে ব্যস্...