Wednesday, May 27, 2015

পঞ্চম

সোমনাথ অবাক হলে অনুপের চিঠি পেয়ে। মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে অনুপ ব্যাটা এমন গুছিয়ে হাতে লেখা চিঠি পাঠাতে গেল কেন? রোজ যেখানে ফোনে কথা হচ্ছে। “চাকরিবাকরি না থাকলে যা হয় আর কী”, সোমনাথ ভাবলে, “ব্যাটা এখন চিঠি লিখে ল্যাদ কাটাচ্ছে”। আনন্দবাজারটা সরিয়ে রাখলে সে। অদিতি ছেলেকে স্যুইমিং ক্লাস থেকে আনতে গেছে। শনিবারের এই অলস সময়টা বেশ লাগে সোমনাথের। মোবাইল স্পীকারে শ্রীকান্ত আচার্যর রিমেক গান নিরিবিলি বেজে চলেছে। পাশের টেবিলে ছুটির আধ খাওয়া ব্রেকফাস্টের প্লেট- লুচি, আলুভাজা আর সন্দেশ। উইকেন্ডের এই সময়ে ইজিচেয়ারটা জাস্ট মায়াবী ভঙ্গিমায় জড়িয়ে থাকে সোমনাথকে। ড্রাইভার কমলেশ চিঠিটা দিতে ভেতরে এসেছিল; সোমনাথের ভাষায় এটা এক প্রকারের ট্রান্স-ভঙ্গ। চিঠিটা খুলে পড়ার আগে সোমনাথ ভাবল অনুপকে ফোন করে সামান্য গাল ঝাড়বে, চিঠি লেখার মত প্রাগৈতিহাসিক একটা কাজ করে ফেলার জন্য। একটা ফোন করলে কি দোষ ছিল?

অনুপের ফোনটা সুইচ্‌ড অফ।

চিঠিটা পেয়ে যে নেহাত খারাপ লাগছিল তা নয়, আজকাল চিঠি ক’টা লোকে পায়। খামটা খোলার আগে উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরের এয়ার কন্ডিশনারটা চালিয়ে দিল সোমনাথ। ইজিচেয়ারে ফেরত এসে খাম ছিঁড়ে চিঠিটা বার করলে। ভালো কোয়ালিটির মোটা কাগজে লেখা চিঠি, ভাজ করা।
চিঠিটা ভাজ খুলে মেলে ধরলে সোমনাথ।

“সোম,
শোন। এর আর কোন মানে হয় না জানিস। মানে এমন জীবনের। চাকরি নেই। বউ কেমন নির্দয় ভাবে ডিভোর্স দিয়ে কেটে পড়লে।পৈতৃক বাড়ি ছিল, তাই মাথায় ছাদ আছে। তবে সে ছাদের ফুটো মেরামতের পয়সা নেই। আর ছাদ মেরামত! ডাল ভাত জুটছে না। তোদের থেকে চেয়ে-চিন্তে আর কতদিন। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন যাই বলিস; তা তো তোরা চারজনই। সেই কলেজের সময় থেকে। আমার কত ঘ্যানঘ্যান সহ্য করে এসেছিস তোরা। তবে আর কতদিনই বা সহ্য করবি।
তোদের সবার কেরিয়ার গ্রাফ এখন তুঙ্গে, এক মাত্রই আমি রয়ে গেলাম এ ফেইল্‌ড কেমিস্ট অ্যান্ড আ ফেইল্‌ড হাসব্যান্ড। সবাই একসঙ্গে জড় হলে আমি যে কী ভীষণ অড ওয়ান আউট হয়ে পড়ি; তোদেরও হয়তো অস্বস্তিতে ফেলে দিই।  
ইন ফ্যাক্ট তোদের সাথে যোগাযোগ ছাড়া কী করে সারভাইভ করবো; সেটা ভাবতেও যেমন চিন্তা হয়- তেমনি তোদের সাথে দেখা করতেও ভয় হয় রে। তোদের জগতটা বড় দূরের হয়ে গেছে রে আমার পৃথিবীর থেকে। ইন ফ্যাক্ট, আমার বারবার মনে হয় আমি হয়তো তোদের এমব্যারাস করে ফেলি আমার ছিঁচকাঁদুনী দিয়ে।
তাই বলছিলাম, এর আর মানে হয় না। তুই, বিপিন, নীলয় আর অভীক; তোদের আমি যে কতটা ভালোবাসি সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। সেই সেকেন্ড ইয়ার থেকে। তবু তোদের থেকে আমায় দূরে যেতে হবেই রে।
তোদের থেকে দূরে চললাম। প্লীজ রাগ করিস না। মৃত্যুর আগের শেষ চিঠি, তাই আর ভ্যানতারা বাড়ালাম না।

ভালো থাকিস।
ইতি
অনুপ”

সোমনাথের মাথাটা বনবন করে ঘুরছিল, শরীরে একটা চাপা অস্বস্তি। অনুপ কি পাগল হয়ে গেল? বিপিনকে ফোন করার জন্য মোবাইলটার দিকে হাত বাড়ালে সে; কিন্তু তার হাত যেন অসাড় হয়ে আসছিল। অনুপ সুইসাইড করতে যাচ্ছে? তাই দু’দিন ধরে ওর কোন খবর নেই? তাই এখন ওর ফোন সুইচ্‌ড অফ
?
**
ভোর তিনটেয় অ্যালার্ম দিয়েছিল অনুপ। ঘুম থেকে উঠে সবার আগে দাড়ি কামিয়ে নিলে। গতকালই একটা নতুন আফটার শেভ এনেছিল; এটা একটা বাড়াবাড়ি রকমের শৌখিনতার কাজ বলা যেতে পারে; তবে আজ আর কিছুই এসে যায় না। পরনের লুঙ্গিটা ছেড়ে একটা হাফ প্যান্ট পরে খানিকটা ফ্রি হ্যান্ড করে নিল সে। সামান্য ঘাম ঝরাটা মনের জন্য ভালো। সোমনাথ, বিপিন, নীলয়, অভীকরা আজকে তার চিঠিটা পাবে, ব্যবস্থাটা সেভাবেই করা। বিগ্‌ ডে। স্নান বাথরুমের কাজ সেরে এসে একটা সুতির পাঞ্জাবী গায়ে চড়াল সে, সঙ্গে পুরনো একটা জিন্‌স। উদ্ভট খেয়ালে খানিকক্ষণ গতকালের খবরের কাগজ পড়ে নিল অনুপ।  

ব্যাগ গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে ভোর পাঁচটা হয়ে গেল অনুপের। অবশ্য, বেশি কিছু সঙ্গে নেওয়ার অবকাশ কোথায়। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে ওরা চিঠিটা পাবে। সোমনাথ সম্ভবত সবার আগে পাবে। 

এত কাছের মানুষজন ছিল ওই চারজন, দূরত্বটা অস্বাভাবিক তো ঠেকবেই। তবে তাকে তাড়াতাড়ি হারিয়ে যেতে হবে। যেতে হবেই। 

ঘটনাটার খবর পুলিশ পাবে আর ঘণ্টা চারেক পর হয়তো। সোমনাথদের লেখা চিঠির কাগজে মাখিয়ে রাখা আছে সেই বিষাক্ত কেমিক্যাল, যার স্পর্শে চামড়ায় দাবানলের মত বিষ ছড়িয়ে পড়ে; পনেরো মিনিটের মধ্যে নির্ঘাত মৃত্যু। সেই বিষাক্ত কেমিক্যাল,  যেটার পেটেন্ট নেওয়ার সাহস হয়নি এতদিন অনুপের। অনুপ জানে যে ওকে কেউ চেনেনি। বন্ধুরাই কেউ পাত্তা দেয়নি ওর ক্ষমতাকে- ভার্মা অ্যান্ড ভার্মা কেমিক্যাল্‌সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর তো কোন ছাড়। অবিশ্যি, বিষাক্ত কেমিক্যাল আবিষ্কার ওই ভার্মা অ্যান্ড ভার্মা কেমিক্যাল্‌সের ল্যাবরেটরিতেই। তার গত কুড়ি বছরের গোপন প্যাশন ছিল – বিষাক্ত কেমিক্যাল নিয়ে পড়াশোনা। দুনিয়া না জানুক, অনুপ নিজে জানে ভারতবর্ষে তার মত রসায়নবিদ খুব কমই আছে।   

বন্ধুত্বের চৌহদ্দিতে অড ওয়ান হয়ে থাকাটা যন্ত্রণার। আর বন্ধুদের করুণার স্পর্শ পাওয়া যে কী রক্তক্ষয়ী, অনুপের চেয়ে ভালো আর কে জানবে? কিছু একটা করতেই হত। আত্মহত্যা ব্যাপারটা অনুপের কাছে ঘৃণ্য মনে হয়। তাই ওই চারজনকেই দূরে ঠেলে দিতে হল। ট্যাক্সিতে উঠে পিঠের ব্যাকপ্যাকের চেন খুলে নাইরোবির টিকিট আর পাসপোর্টটা আরেকবার দেখে নিল অনুপ।   

2 comments:

অরিজিত said...

অসাধারণ। :)

Anindya Mitra said...

অসাধারণ। যেমন হয় বংপেন এর গল্পগুলো। শেষে এসে গল্প র নতুন মোচর। তবে একটা জিনিস চোখে লাগলো। শনিবার এ রবিবারের আনন্দবাজারটা সরিয়ে রাখলো??
যদিও আগের হপ্তার রবিবারের হতেই পারে।