Saturday, July 28, 2018

অলোক দত্তর থেরাপি

টেবিলের ওপর দুদ্দাড় করে একের পর এক ফাইল এসে পড়ছে; আর অলোক দত্ত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছেন; ফাইলের ঢিপি তরতর করে বড় হচ্ছে। বড়বাবুর পাঠানো ফাইল; প্রত্যেকটার ওপর হলুদ স্লিপ সাঁটা; ড্যাবা ড্যাবা করে লেখা “আর্জেন্ট, প্রসেস্‌ বাই টুডে”। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরবেন ভেবেছিলেন; সেই মত দু’দিন আগে বড়বাবুকে বলেও রেখেছিলেন, বৌ গড়িয়াহাটে আসবে; জরুরী কেনাকাটি।  কিন্তু টেবিলের বোঝা দেখে বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল দত্তবাবুর। ফাইলের ওপরে লেখা ‘আর্জেন্ট’ শব্দটা বারবার বুকে গোঁত্তা খাচ্ছিল, ও’দিকে এই মাত্র বৌয়ের এসএমএস এলো; “চারটের মধ্যে বেরিও, আমায় যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা না করতে হয়”। বুকে মৃদু প্যালপিটেশন টের পাচ্ছিলেন দত্তবাবু। গত মাসে গড়িয়াহাটে যাওয়ার প্ল্যান তিন তিনবার ভেস্তেছে। নার্ভাসনেসটা কাটানোর জন্য পাড়ার হরি-চপওয়ালার টইটুম্বুর কড়াইটার কথা ভাবতে শুরু করলেন তিনি। মেঘলা বিকেল, তেলে টইটুম্বুর কড়াই; টগবগিয়ে রিদ্‌ম তৈরি হচ্ছে। সে মনমোহিনী কড়াইয়ে পাশাপাশি ভাসছে বেগুনি আর আলুর চপ; মন-কেমনের সুবাসে বাতাস ভারি হয়ে রয়েছে। স্যান্ডো গেঞ্জি আর নীল লুঙ্গি পরে নির্ভীক রাজপুতের মত বসে হরি সমাদ্দার, চোখ কড়াইয়ে, কিশোরকুমারের গানের কলি হরদম তার ঠোঁটের ডগায় তিরতির করে নাচে। ঝাঁঝরিতে চপ তোলার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অলোক দত্ত টের পেলেন যে বুকের প্যালপিটেশনটা কমে এসেছে। এই থেরাপিটা বড্ড কাজে দেয়।

নাহ্‌, ফাইলের চাপে নুয়ে পড়লে চলবে না। বড়সাহেবের রুমে একবার একটু মিছরি ভেজানো গলায় রিকুয়েস্ট করতেই হবে। লাঞ্চের পর দস্তুর অ্যান্ড কোম্পানির রিকনসিলিয়েশন ফাইলটা নিয়ে দত্তবাবু সোজা ঢুকলেন বড়সাহেবের চেম্বারে।

- কী ব্যাপার দত্তবাবু?
- ইয়ে স্যার, এই দস্তুরের ফাইলটা রেডি।
- রেডি?
- রেডি।
- আমি তো চারটে ফাইল পাঠিয়েছিলাম আপনাকে। বাকিগুলোর কী হল?
- ইয়ে, আরও একটা অলমোস্ট তৈরি বুঝলেন। আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই...।
- আর বাকি দু’টো?
- আজ্ঞে?
- বাকি ফাইল দু’টো?
- স্যার, আসলে একটা রিকুয়েস্ট নিয়ে এসেছিলাম...।
- রিকুয়েস্ট?
- আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত স্যার, একটা জরুরী কাজ ছিল...।
- আই সী। আই সী। তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত, তাই না? শুধু সে’টুকু কেন। আর কী কী করলে ভালো হত, সে’গুলোও বলে দিন। অফিস দেরী করে আসতে পারলে ভালো হত। লাঞ্চে আধ ঘণ্টার বদলে দেড় ঘণ্টা খেজুরে আড্ডায় নষ্ট করতে পারলে ভালো হত...।
- আজ্ঞে আসলে...।
- গোটা দিন মোবাইলে ক্রিকেট কমেন্ট্রি চেক করে মাস গেলে মোটা মাইনে পেলে ভালো হত। বসের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে অফিসটাকে কফিহাউস বানানো গেলে ভালো হত। আর কী কী করলে ভালো হত দত্তবাবু?

এই। এই শুরু হল বড়সাহেবের দাঁত খিঁচুনি, মানসম্মানের বিরিয়ানিতে কারিপাতা-এলাচ না ঢালা পর্যন্ত তার স্বস্তি হয় না। মাথা নিচু করে অলোক দত্ত শুনে যাচ্ছিলেন, আর বড়সাহেব টেবিল চাপড়ে চোপা করে যাচ্ছিলেন। দত্তবাবু সাধারণত সবার আগে অফিসে ঢোকেন, সাধারণত সবার শেষে অফিস থেকে বেরোন; তবু। শুনে যেতে হচ্ছিল, বড়বাবু বলে কথা। বাল্মীকির সাজেশন উড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু বসের খিস্তি হজম না করলেই গোলমাল। ক্রমশ কান গরম হচ্ছিল, বুকের ঢিপঢিপ বাড়তে শুরু করেছিল, মাথার পিছন দিকে টিপটিপ। ঠিক্ তক্ষুনি অলোকবাবু নিজের মনটাকে থেরাপির দিকে ঠেলে দিলেন; চোখের সামনে ভেসে উঠলো স্টিলের থালায় বাটি বসানো ভাত; দুধের-সর চাল। ভাতের ঢিপি থেকে ধোঁয়া উঠছে, দৃষ্টি আদরে ঝাপসা হয়ে আসছে। থালার পাশে ছোট বাটিতে ইলিশ মাছের কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা দেওয়া ঝোল, সঙ্গে দু’টুকরো বেগুন। রগরগে নয়, কেতদুরুস্ত নয়; অথচ মায়াবী, ভালোবাসার। ডান হাতের মধ্যমা আর তর্জনী দিয়ে ভাতের ঢিপির মাথায় ছোট্ট ডিপ্রেশন তৈরি করে ইলিশের বাটি উপুড় করা। অতটুকু ভাবতেই কান গরমটা কেমন কমে এলো, বুকের ঢিপঢিপ আর মাথার টিপটপ – দুটোই গন্‌। বড়সাহেবের কপালে চিন্তার ভাজগুলো নজরে পড়ল; আহা, ওঁরও তো ওপরওয়ালা আছে; ওঁর মাথায় তো আরও বেশি চাপ। বড়সাহেবের গিন্নীর কোনও একটা কঠিন অসুখ হয়েছে; তার জন্য বিস্তর দৌড়ঝাঁপ খরচাপাতি দুশ্চিন্তা লেগেই আছে। এর ওপর অফিসের হাজার রকমের টার্গেট। আহ্‌, না হয় লোকটা দু’একটা বাড়াবাড়ি রকমের কড়া কথা শুনিয়েছে; তাই বলে কি আর অভিমান করে বসে থাকলে চলে? বেশ একটা হাসি মুখে ‘সরি’ বলে বড়সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত। বেরোবার সময় বড়সাহেব একবার বাঁকা সুরে “যত্তসব” বলেছিলেন; তা সে’টা গায়ে মাখেননি দত্তবাবু।

নিজের টেবিলে ফিরে এসে নতুন উদ্যমে শুরু করলেন ফাইল দেখার কাজ, এ’গুলো আজকেই শেষ করে বেরোতে হবে। রাত একটু হবে বটে, তা হোক গে। তরতর করে কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল। কাজের ফ্লোতে একটু রামপ্রসাদীর সুরও লেগে গেছিল; ছন্দপতন ঘটল সাড়ে তিনটে নাগাদ! বৌকে জানানো হয়নি যে, গড়িয়াহাট প্ল্যান আজ ক্যান্সেল। চটপট ফোন করলেন। বেশ মোলায়েম গলায় একটা “অ্যাই শুনছো” ভাসিয়ে দিলেন। অবশ্য এই এক্সট্রা-মখমলে “অ্যাই শুনছো” অবশ্য বৌ বেশ চেনে;
- কী ব্যাপার? ফোন করেছ কেন? কোনও ধান্দাবাজি নয়। চারটে বাজলেই অফিস থেকে বেরোবে।
- অ্যাই সুমি, ধান্দাবাজি আবার কী ধরণের ভাষা।
- আমায় আজ যদি ফের অপেক্ষা করিয়েছে, তখন দেখবে ভাষার টেম্পারেচার কী খতরনাক হতে পারে।  
- আজ ওয়েট করাব না।
- গুড।
- না গুড না।
- মানে?
- মানে,সমস্ত ব্যবস্থা করা ছিল জানো, বিশ্বাস করো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এতগুলো জরুরী ফাইল চলে এলো যে...।
- তুমি আসছ না?
- আজ নয়, তবে আগামীকাল বেরবোই! শিওর শট। দরকার হয় আমি আজই আগামীকালের হাফ ডে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বেরব।
- তুমি থামো। পাড়ার লোকজনের দরকারে হুট করে ঠিক অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তে পারো। অফিস কল্যিগদের সঙ্গে দীঘায় গিয়ে ফুর্তি করার সময়টুকু ঠিক পেয়ে যাও। শুধু আমার দরকারের ব্যাপারেই যত শয়তানি, তাই না?

ব্যস। অমনি শুরু হল ফর্দ ফায়ার করা। কবে মুকুটমণিপুর ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছে, কবে শাশুড়িকে আনতে হাওড়া স্টেশন যেতে পারেননি, কবে ন নিজের বোকামির জন্য বৌকে তার বান্ধবীদের সামনে অপদস্থ করেছেন; সমস্ত। তাল তাল ইউরেনিয়াম যেন কেউ ড্যালা পাকিয়ে তার মুখে থেবড়ে চলেছে। সুমির ফায়ারিংয়ে কমা, ফুলস্টপ নেই; কাজেই দত্তবাবু কিছু বলতেও পারছেন না। দুম করে ফোন রেখে দিলে থানাপুলিশ হয়ে যেতে পারে। আর তখনই শুরু হল, বুকের ভিতর আনচান, পেটের ভিতর গুড়গুড়। ব্যাপারটা মাথা ঝিমঝিম পর্যন্ত গড়াতেই অলোক দত্ত সোজা গিয়ে ঢুকলেন থেরাপির মধ্যে। ভদ্রলোকের মনের মধ্যে নিমেষে তৈরি হল লোহার চাটু, তার ওপর খুন্তির খনখন। তেলের চড়চড়ে একটা পরোটা মজবুত হয়ে উঠছিল; আর তারপর জোড়া ডিম ফাটিয়ে দু’টো কুসুম ভাসিয়ে দেওয়া হল পরোটার বুকে। এরপর সেই কুসুম-জোড়া খুন্তির সূক্ষ্ম চাপে ঘেঁটে গিয়ে মিশে গেলে পরোটায়। এক মিনিটের মাথায় সেই মাপা হিসেব আর চাপা কবিতা বোঝাই পরোটা নেমে এলো চাটু থেকে। তারপর সৃষ্টি হল পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা লেবু আর বিটনুনের পুর পাকানো রোল।
স্মিত হাসলেন অলোক দত্ত। তাঁদের যখন বিয়ে হয় তখন সুমির বয়স কত অল্প। পড়াশোনায় অলোকবাবুর চেয়ে হাজার-গুণে ভালো; কিন্তু আর পাঁচটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয়। সুমির কোনোদিনও একটা কেরিয়ার হল না, হওয়া উচিৎ ছিল। অবশ্য এ নিয়ে সুমি কোনোদিন অভিযোগ জানায়নি, কিন্তু একটা চিনচিনে অপরাধ-বোধ মাঝেমধ্যেই অলোকবাবুর মাথায় ঘুরপাক খায়। মেয়েটা বড় অল্পে খুশি, গোটাদিন খেটে চলে; চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বটে; তবে মনটা বড় ভালো। কখনো কারুর অমঙ্গল কামনা করে না, লোভ নেই। সুমির তেমন বড় কোন শখ আহ্লাদও নেই; শুধু এই মাঝেমধ্যে বাজারঘাটে যেতে চায়; সে’টুকুও আসলে অলোকবাবুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জন্যেই। বেশ বুঝতে পারেন অলোকবাবু। অথচ বার চারেক প্ল্যান করেও সামান্য গড়িয়াহাট যাওয়া হয়ে উঠছে না। সুমির না রাগাটাই আশ্চর্যের। অলোকবাবু ঠিক করলেন আজ বরং বাড়ি ফেরার সময় সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল কিনে ফিরবেন, হালকা দেখে। একটা বেশ জব্বর সারপ্রাইজ হবে।

মিনিট  দশেক পর সুমি নিজেই ফোন কেটে দিল। বড্ড রেগে গেছে। সে’টা অবশ্য অলোকবাবু সামাল দিতে পারবেন। ফোন রেখেই ভদ্রলোক ফাইলে ডাইভ দিলেন। যখন ঘোর কাটল তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। সমস্ত কমপ্লিট। বড়সাহেব অবশ্য বেরিয়ে গেছিলেন, সেক্রেটারি বললেন কোনও একটা পার্টি অ্যাটেন্ড করার জন্য অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছেন তিনি। অগত্যা ফাইলগুলো বড়সাহেবের টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত।

গৌরহরি জুয়েলার্স থেকে সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল আর মাইতি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে ছ’টা ক্ষীরকদম কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে পৌনে দশটা হয়ে গেল। দরজায় তালা, দরজার সামনের পাপোশের নীচে সুমির চিরকুট।
“মেজদির বাড়ি যাচ্ছি, রাতে ফিরব না। ফোন করতে যেও না, ফোন স্যুইচ অফ রাখব। তোমার সঙ্গে আজ আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। খাবার চাপা দেওয়া আছে; গিলে উদ্ধার কোরো”।   

হাত পা ধুয়ে, জামা কাপড় বদলে ডাইনিং টেবিলে বসলেন অলোকবাবু। বড্ড ক্লান্ত লাগছিল তাঁর, জিভে অরুচি। মাথা ব্যথা। গায়ে সামান্য জ্বর আছে বোধ হয়। কোনোক্রমে খাওয়াদাওয়া সেরে শোওয়ার ঘরে এসে বাতি নিভিয়ে লম্বা হলেন বিছানায়। উত্তরের জানালাটা খোলা, স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো এসে পড়ছে ঘরে। সেই আলোয় দেওয়ালে টাঙানো ছবিতে মায়ের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মা। কী অদ্ভুত, চোখ বুঝতে যেন মায়ের মুখটা আরও স্পষ্ট হল। মা, মাগো। ছোটবেলার গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। শনিবার রাত্রে মা সামান্য বেশি ভাত নিতেন, সেই বাসি ভাত একটা থালায় নিয়ে মা ব্যাটা পরের দিন সকালে একসঙ্গে জলখাবারে বসত। বাসি ভাতের পাশে কুমড়ো ফুলের বড়া আর মৌড়লা বা চুনো মাছ ভাজা। নুন, লেবু, লঙ্কা দিয়ে মা ভাত মাখতেন জম্পেশ করে। তারপর একদলা ছেলের মুখে, আর এক দলা মায়ের। মা অবশ্য মাছভাজা আর কুমড়োফুলের বড়াটুকু বেশির ভাগটাই খোকাকে খাইয়ে দিতেন। হাপুসেহুপুসে অল্প সময়ের মধ্যেই থালা সাফ হয়ে যেত।

স্পষ্ট দেখতে পারছিলেন অলোকবাবু; মায়ের হাসি মুখ, নীল ছাপার শাড়িতে হলুদ ফুল, সরু সরু আঙুল দিয়ে মাখা ভাত, ছোট্ট বাটিতে মাছ ভাজা আর একটা ছোট স্টিলের থালায় কুমড়ো ফুলের বড়া। বেঢপ পুরনো সেগুন কাঠের টেবিল। পাশের ঘরে পুরনো টেপরেকর্ডারে বাবা মান্নাবাবুর গান শুনছেন; “কবে আর আসবে সময়, বাসবে ভালো, ভাসবে ময়ূরপঙ্খী ভেলা”।

মাথা ব্যথা কমে যাওয়ায় অলোকবাবুর ঘুমিয়ে পড়তে বিশেষ অসুবিধে হল না। অবিশ্যি বালিশের কতটা তাঁর চোখের জলে ভিজেছে আর কতটা জিভের জলে; তার সদুত্তর তিনি নিজেও দিতে পারবেন না।

No comments: