হরিহরের রেস্টুরেন্ট

১।

- ম্যাডাম, আমি এখানে বসতে পারি?
- হুঁ?
- আমি এখানে বসতে পারি?
- না।
- ম্যাডাম, প্লীজ। ঠ্যাং টনটন করছে। আর দু'টো কফি আর একটা স্যান্ডুইচ বই তো নয়। বসি?
- না।
- আরে, দু'টো চেয়ারের টেবিল। আপনি একা। ও'দিকের চেয়ার খাঁখাঁ করছে। প্লীজ।
- আমার বয়ফ্রেন্ড আসছে। আমি ওর ওয়েট করছি।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। একটা কফি আর একটা স্যান্ডুইচ, ওকে?
- আপনি তো রীতিমত বেয়াদপ।
- খিদের জ্বালায় এটিকেট ঠেটিকেট জাস্ট বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। বসি?
- চেয়ার টেনে বসে পড়ে আবার জিজ্ঞেস করছেন?
- কনুইয়ে অযথা মেনুটা চেপে রেখেছেন। একটু এ'দিকে ঠেলে দেবেন? শুনেছি একটা ভালো মাছের পকোড়া অ্যাড করেছে মেনুতে। ভেটকি, তবে ফিশ ফিঙ্গার বা ফ্রাই নয়। একবারের জন্য দিন মেনুটা, প্লীজ। আর এদের ভেটকির গ্যারেন্টি আমার।
- আমি এ'বারে ওয়েটারকে ডেকে আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
- ডেকে লাভ নেই।
- ওয়েটার! ওয়েটারদাদা! একটু প্লীজ এ'দিকে আসুন।
- গরীবের কথা বাসি হলে পছন্দ হবে। পইপই করে বললাম ডেকে লাভ নেই।

***
২।

- বলুন ম্যাডাম!
- ওয়েটারদাদা! এই লোকটা আমার সঙ্গে অসভ্যতা করছে।
- কোন লোকটা ম্যাডাম?
- ওই, আমার সামনের চেয়ারের এই লোকটা। আমি একে চিনিনা। জোর করে এ'খানে বসে...।
- এই চেয়ারে?
- হ্যাঁ!
- ম্যাডাম, আমরা ব্যস্ত, প্লীজ এমন ঠাট্টা করবেন না।
- মানে? এই লোকটা আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করছে আর আপনি ঠাট্টা ভাবছেন?
- কোন লোকটা ম্যাডাম? আপনার সামনের চেয়ার তো খালি! আপনার আর কিছু অর্ডার দেওয়ার না থাকলে...।

****

৩।

- কতবার বললাম, ওয়েটারকে ডাকবেন না। কে শোনে কার কথা।
- না মানে...এ'টা এত অদ্ভুত!
- আপনি পারেন বটে। এ'বার মেনুটা এ'দিকে দিন দেখি।
- আপনি ভূত?
- নয়ত এমন গায়েব হয়ে ঘোরাঘুরি করার ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে হত।
- আপনার নাম কী ছিল?
- নাম মরে না। নামটা ছিল নয়, আছে। দীপক। দীপক চ্যাটার্জী। আপনি?
- কুন্দকলি দত্ত।
- আপনার বয়ফ্রেন্ডের নাম কী?
- ভাঁওতা ব্যানার্জী।
- শুরুতেই ধরেছিলাম।
- বাজে কথা। যাক গে, এ'খানে আমি বেশি কথা বললে লোকে পাগল ভাববে আমায়। নিজে নিজে বকবক করে যাওয়াটা বড্ড অশোভন। বাইরে যাবেন?
- প্রথম আলাপেই ডেট? আপনি বড্ড গায়ে পড়া দেখছি।
- বেশ, আপনি থাকুন। আমি আসি। ওই ওয়েটার তখন থেকে আমার দিকে কেমন বিশ্রী ভাবে তাকাচ্ছে...।
- ইন্সিস্ট করছেন যখন...ঠিক আছে। তবে আপনি নিশ্চিত তো?
- ভয় পাচ্ছেন দীপকবাবু? মানুষের ভয়?
- যত্তসব! চলুন!

***

৪।

দীপক বেরিয়ে যেতেই তড়িঘড়ি রেস্তোরাঁর ঝাঁপ নামালেন হরিহর। ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে, ঝড়ও উঠেছে।

যতবারে নিজের মনে 'রেস্তরাঁ' বলেন, ততবার হেসে ফেলেন হরিহর। একা হাতে রান্না, নিজেই সার্ভ করা। আর একজন মাত্র খরিদ্দার!  তাও বিনেপয়সার খানেওয়ালা। তার ওপরে আবার সে খদ্দের বদ্ধ পাগল। যে সে পাগল নয়; নিজেকে ভূত ভাবা পাগল। এ'দিকে এই খদ্দেরের বায়নাক্কা কম নয়, হরিহরের এক উটকো দায়িত্বও আছে; সে পাগলের সামনের ফাঁকা চেয়ারের দিকে তাকিয়ে মাঝেমধ্যে কথা বলে না আসলেই নয়।  তবু দীপকের মায়া কাটানো যায়না, ওর জন্যই টিকে আছেন বিরাশি বছরের হরিহর। মা-বাপ মরা পাগলা ভাইপোটা বড় ভালো, বড় মায়ার।

যদ্দিন চলে এইভাবে, তদ্দিনই।

কিন্তু যার জন্যে ছেলেটা নিজেকে মড়া ভাবে, সে মেয়ে কি মরেও শান্তি পেয়েছে? তাঁর আত্মা কি মাঝেমধ্যে দীপকের সামনের ফাঁকা চেয়ারে এসে বসে না? ঠিক যেই ভাবে কুন্দকলি আর দীপকের প্রথমদিন দেখা হয়েছিল? এই টেবিলেই? গায়ে পড়ে এসে আলাপ করেছিল দীপক। ক্যাশবাক্সের ও'পাশ থেকে দিব্যি নজর রাখছিলেন হরিহর। সে কদ্দিন আগেকার কথা; তখন এই রেস্তোরাঁটা মরে ভূত হয়ে যায়নি। বড্ড মায়া মিশে আছে; এই মরা রেস্তোরাঁতে।

শেষ জানালাটা বন্ধের সময় হরিহরের মুখে বাদলা হাওয়া  ঝাপটা এসে পড়ল। এখনও মাঝেমধ্যেই মনভালো হয়ে যায় তাঁর।

Comments

Popular Posts