Saturday, December 23, 2017

রামশঙ্কর পাকড়াশির ডায়েরি - ২

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭, 
রাত বারোটা বেজে বাইশ মিনিট। 
কলকাতা। 
............

আজকের দিনটা বেশ চমৎকার ছিল। মূলত দু'টো কারণে। 

প্রথমত, আজ অল্প হলেও বাতাসে শীত শীত ভাব ছিল। কাটোয়া নিবাসী খুড়তুতো ভাই কমলেশের থেকে বছর দুই আগে একটা চমৎকার নীল রঙের হাফ জ্যাকেট ধার নিয়ে ফেরত দেওয়া হয়নি।  ফেরত  না দেওয়ার একটা কারণ অবশ্য আছে; ওর থ্যাবড়ানো নাকের সঙ্গে অমন স্মার্ট জ্যাকেট কিছুতেই মানায় না। এ'দিকে আমার এস্থেটিক সেন্স চিরকালই বড্ড টনটনে। গত বছর শীত পড়ার ঠিক আগে কমলেশ একবার আমার বাসায় এসে ফোন করেছিল। বুঝেছিলাম ব্যাটার কুমতলব আছে; সামান্য একটা হাফ জ্যাকেটের লোভে বাড়ি পর্যন্ত হানা দিয়েছে। আমি বলে দিয়েছিলাম আমি অফিসের ট্যুরে শহরের বাইরে, ফেরার ঠিক নেই। সে'দিন অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে সোজা চলে গেছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি। জ্যাকেটটাও অপাত্রে ফেরত দিতে হল না, আবার বন্ধুর বাড়িতে ডিনারটা মন্দ হয়নি। নিখরচায় মাংস ভাতে নাকি আয়ুর্বৃদ্ধি ঘটে। কলকাতায় আবার শীতটীত তেমন পড়ে না, কিছুতেই এদ্দিন সুযোগ পাচ্ছিলাম না জ্যাকেটটা পরার। আজ পরেছিলাম। পারচেজ সেকশনের দীপ্তি এসেছিল একটা ফাইল প্রসেসিংয়ের ব্যাপারে।  ওর চাউনিটা আজ অন্যরকম ছিল। অল্প মাখোমাখো, কিছুটা দীর্ঘশ্বাস। অবশ্য সে'টা জ্যাকেটের জন্য না আমার একপেশে মন কেমন করা হাসিটার জন্য জানি না। দীপ্তির বরকে কয়েক মাস আগে একদিন অফিসের পর দেখেছিলাম, বেশ একটা হামবড়া ভাব। বড় চাকরি করে বলে সকলের মাথা কিনে রেখেছে যেন। অমন চাকরী আমি চাইলেই গণ্ডায় গণ্ডায় পেতে পারতাম। নেহাত  গ্রহ নক্ষত্রের অ্যালাইনমেন্ট ঠিকঠাক ছিল না তাই। যাক গে। আমার ধারণা দীপ্তির বর আমার চেয়ে হাইটে অন্তত হাফ ইঞ্চি ছোট, আমার পাশে দাঁড়ালে সামান্য ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগবে, সে'টাই স্বাভাবিক। দীপ্তি আমায় পছন্দ করে, আমি বুঝতে পারি। সামান্য মায়া আছে বটে তবে আমি দীপ্তিকে পাত্তা দিই না। কবে অকারণ কফিটফির পিছনে খরচ হয়ে যাবে, কী দরকার। 

দ্বিতীয়ত, আজ অনিন্দ্য অফিসে আসেনি। অত্যন্ত গবেট ছোকরা। গাধার মত অকারণ কাজ করে যাবে। অথচ জেনারেল নলেজের প্রশ্ন করলেই চিত্তির। জেনারেল নলেজ; যেমন ক্রিকেট, পলিটিক্স, আলু পোস্তর ভ্যারিয়েশন, বড়সাহেবের সেক্রেটারির মায়াময় স্কার্ট; এইসব। আর জেনারেল নলেজ বাড়বে কী করে? অফিসে যত মনোগ্রাহী আড্ডাই হোক, সে থাকবে ফাইলে মুখ গুঁজে। যেন আর দু'টো ফাইল পাস করতে পারলেই বাবু নোবেল পাবেন। একা হাতে গোটা অফিসের ওয়ার্ক কালচারে গোলমাল পাকাচ্ছে ছোকরা। সেদিন ইস্ট বেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে জমজমাট আড্ডার মধ্যে ফস করে বলে বসল আমি নাকি গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল নিয়ে বহুদিন ধরে বসে আছি। কী ইনসাল্ট! সে'দিনের ছোকরা বলে কিনা আমি ফাইলের ওপর বসে আছি? হপ্তা দুই ফাইল আমার টেবিলে ছিল বটে (ডিসেম্বরে কেমন হাত পা জড়িয়ে আসে, ছুটোছুটি করে কাজ করতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে)! তাই বলে অমন ভাবে মুখের ওপর বলবে? আমার কিছু একটা করতেই হত। অন্যায় যে সহে আর জ্ঞান যে হজম করে; ঘৃণাটৃণা যেন তাঁরে কিছু একটা করে টাইপ কথা আছে না? আমিও বলে দিলাম; গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল আমার টেবিলে আসেইনি। রাস্কেল অনিন্দ্য বলে কিনা সে নিজের হাতে আমার টেবিলে পৌঁছে দিয়ে গেছে। সাহস ভাবুন! আমি হলফ  করে বলায় অবশ্য সে মিইয়ে গেল। আজ সে আসেনি দেখে আমার গোপন দেরাজ থেকে সেই গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল বের করে পিওন উমাপ্রসাদকে দিয়ে অনিন্দ্যর টেবিলে পাচার করে দিয়েছি। বড়সাহেবের কানেও তুলে দিয়েছি কথাটা;  গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল নিয়ে অনিন্দ্য হপ্তার পর হপ্তা বসে আছে। দু'দিন পর অফিসে এসে অনিন্দ্যর পিলে চমকাবে। আসলে প্রতিবাদ জিনিসটা আমার মজ্জায়। আর প্রতিবাদ করতে হলে কিছু খরচটরচ করতে হয়; উমাপ্রসাদকে এক প্যাকেট মার্লবোরো খাওয়াতে হবে। তবে ভাগ্য ভালো গত সেপ্টেম্বরে মুকুল দত্তের পার্টি থেকে খান দুই বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট সরিয়েছিলাম। আমি অবিশ্যি সিগারেট খাই না, তবে কখন কী প্রয়োজন হয়। আমার কুষ্ঠীতে লেখা আছে, আমার দূরদৃষ্টি নাকি অনেকের ঈর্ষার কারণ হবে। 

সত্যিই শীত এলো বোধ হয় শহরে। বেশ চনমনে বোধ করছি। 

No comments: