Thursday, December 21, 2017

রামশঙ্কর পাকড়াশির ডায়েরি - ১

২১ ডিসেম্বর, ২০১৭, 
রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। 
কলকাতা। 
............

আমার নাম রামশঙ্কর পাকড়াশি। নামের ওজন শুনেই ধরে ফেলা উচিৎ যে নামটা বানানো। অবশ্য সবাই যে চট করে ধরে ফেলতে পারবে তা নয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি; যে কোনও বিষয় আমি তুড়ি মেরে বুঝে ফেলি অথচ আমার আশেপাশের মানুষজন মাথা ঠুকে ঠুকে হন্যে হয়েও সে বিষয়টা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেন না। যা হোক, দুনিয়াটা হাফ গবেট আর ফুল গবেটে ভর্তি, সে নিয়ে দুঃখ করে বিশেষ লাভ নেই। 

আর এই বেহেড দুনিয়ায় রামশঙ্কর পাকড়াশি হয়ে জন্মানো যে কী বিশ্রী ব্যাপার! নামটা বানানো কিন্তু এক্সিস্টেনশিয়াল ফ্রাস্ট্রেশনটা জেনুইন। যা হোক, এক গবেট ব্লগারকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করাতে পেরেছি, সে কথা দিয়েছে যে তার ব্লগে আমার রোজনামচা বেনামে (বেনাম বললাম বটে, তবে রামশঙ্কর পাকড়াশি নামটা আমার দিব্যি পছন্দ হয়েছে) প্রকাশ করবে। উপকারটা অবশ্য তারই, তাঁর দরকচা মারা ব্লগের লজ্জা খানিকটা হলেও ঢেকে যাবে আমার কলমের আঁচড়ে। 

যাক গে। সে'সব কথা থাক। 

আমার পরিচয় প্রসঙ্গে বলি; শের শাহর রাজ্য পরিচালনা সম্বন্ধে কিছু কথা কি দু'লাইনে বলা সম্ভব? ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং টেকনিক কি খান দুই ট্যুইট লিখে বোঝানো সম্ভব। তেমনই আমার পরিচয়ও স্যাট্‌ করে দু'চার কথায় ঠাহর করতে পারবেন না। 

বিশ্বাস করুন। পারবেন না। এই যদি আমি বলি আমার বয়স একচল্লিশ, পেশায় সরকারি অফিসের ক্লার্ক, বিয়েথা করিনি আর নেশায় সিগারেটিস্ট; তাহলে কি আমার চরিত্রের ব্যাপ্তিটুকু কোনও ভাবে ধরতে পারবেন? গড়পড়তা মানুষ হলে পারবেন না। তবে আমার বিশ্বাস আমার মূল্য ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েটরা অন্তত ধরতে পারবে। 

ভাবছেন ঠাট্টা করছি? আমার কথাবার্তা শুনে বাবাও তাই ভাবতেন। কী আর করা যাবে বলুন, আমাদের সমাজে যে'টা সবার চেয়ে বড় সমস্যা; পাইকারি মায়োপিয়া। আমার মা অবশ্য বিদুষী ছিলেন; তিনি চিরকাল জানতেন আমি ব্রিলিয়ান্ট। টপাটপ অঙ্কে ফেল করেও মায়ের কনফিডেন্সকে দমিয়ে দিতে পারিনি; মা বুঝতেন যে অঙ্কটঙ্ককে আমি চাইলেই পোষা কুকুরের মত বিস্কুট ছুঁড়ে ল্যাজে খেলাতে পারি। কিন্তু আমায় বাঁধবে এমন দম স্কুল সিলেবাসের কী করে থাকবে? সমগ্র জগত-সংসারের সেই ক্ষমতা নেই। 

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? সরকারি অফিসের গ্রেড ফোর ক্লার্ক মানেই সে ব্রিলিয়ান্ট নয় ভেবেছেন? পাঁচটা মেয়ে আমার প্রেম সঠিক ভাবে ধারণ করতে পারেনি, মানছি। কিন্তু ক্ষতিটা কাদের হল? নিউটনের মাথায় আপেল ঝরে না পড়লে ক্ষতি নিউটনের হত না আপেলের? উপমাটা ধরতে না পারলে বুঝবেন যে আপনিও গবেট আর সেমিগবেট স্পেকট্রামের মধ্যে কোথাও আছেন। যা হোক, মন খারাপ করবেন না ভাইটি, আফটার অল আপনি মেজরিটির দলে রয়েছেন।    

ভূমিকাটা একটু লম্বা হল। আমি আবার কীবোর্ডে লিখি না; ধবধবে সাদা ফুলস্কেপ কাগজ আর ফাউন্টেন পেন (আমি ঠিক করেছি নিজের ডায়েরিকে সাহিত্য গুণে ঠকাব না) । একটানা লিখলে আবার আমার কবজি আর আঙুল টনটনে করে ওঠে; একিলিস হীল আর কী। কেউ তো আর নিখুঁত হতে পারে না। ব্র্যাডম্যানেরও টেকনিকে ফাঁক ছিল, রবীন্দ্রনাথেরও দাড়ি কামানোর বাক্স ছিল। এই কবজির টনটন আর আঙুলের চিনচিনের জন্যই সাহিত্যের পরীক্ষাগুলোয় নম্বরটম্বরগুলো একটু কম পেতাম। অবিশ্যি তাই বলে মাঝেমধ্যে আমায় ফেল করানোটা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর সে'টা আমার নয় , সিস্টেমের ব্যর্থতা ছিল। সম্ভবত ক্লাস নাইনে; "হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন" নিয়ে একটা প্যারা লিখেছিলাম মনে আছে, ভাবলে আজও চোখে জল আসে। পরীক্ষার খাতাতেও টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়েছিল। মধুবাবুর প্যাথোস থেকে "বিবিধ রতন" তুলে বিবিধ ভারতীর গানের অনুষ্ঠান নিয়ে দু'চার কথা লিখেছিলাম। তুলে ধরেছিলাম সঞ্চালকের ন্যাকামির প্রাবল্য। আর তারই পাশাপাশি দুঃসাহসিক ভাবে রতনের সঙ্গে শুয়োরের কচু চেনার ন্যাক্‌ নিয়ে চমৎকার একটা ট্যুইস্ট খাটিয়ে এম্পিরিকাল ডেটা চেয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। ফলে যা হওয়ার তাই হল। তেমন লেখা আর তেমন প্রশ্ন হজম করার ক্ষমতা আমাদের সিস্টেমেরই নেই, আমাদের বাংলার টিচার অমলবাবু তো নস্যি। 

যা হোক। ব্রিলিয়ান্স গোবর নয় যে হাতে এক তাল নিয়ে ফ্যাটাস করে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারব। আজ এ'টুকুই থাক। 

মাঝেমধ্যে লিখব'খন। ক'দিন ধরেই মনে হচ্ছিল; এই অপার ব্রিলিয়ান্সের বোঝা আর কদ্দিন বইব। 

দেখি, ডায়েরির মাধ্যমে কতটুকু বিলিয়ে দিতে পারি। 

No comments: