Sunday, February 21, 2016

শশধরের চিঠি

- বিপিনদা। 
- হুঁ। 
- খেলতে এলে না আজ?
- ব্যথা। 
- পঞ্চার ট্যাকেলটা ট্রাবল দিচ্ছে বুঝি?
- পঞ্চার ট্যাকেল? লাথি বল। লাথি মারা ছাড়া আর কীই বা শিখলে নববালক সঙ্ঘের ছেলেপিলে গুলো? তবে এ শর্মাকে ঘায়েল করতে পারে; সে পা হুগলী ডিসট্রিক্টে নেই রে। 
- ওহ। ব্যথা পায়ে নয়?
- হৃদয়। চোট সেখানে। 
- চোট? প্রেমে -ট্রেমে পড়লে নাকি বিপিনদা?
- প্রেম? না রে। তা নয়। আমার পার্সোনালিটির সঙ্গে মিনমিনে প্রেম ব্যাপারটা যায় না। আগেকার স্বয়ম্বর-টয়ম্বরের সিস্টেম থাকলে তাও ভিতরে একটা চার থাকত। থ্রিল ছাড়া এ বান্দা কোন কাজ করে না। 
- প্রেম থ্রিল নয়?
- এ যুগে তো নয়ই। ম্যাস্কুলিন প্রেমিকের যুগ শেষ হয়ে গেছে রে। টকাটক মাছের চোখে তীর মারব আর রাজকন্যা গেঁথে তুলব, সে চার্ম কোথায় এখন? অমিত রায় টাইপ ডায়েরি প্রেমিকের যুগ। আটার ডিজেনারেশন। এ'সময়ে প্রেমে পড়ে হৃদয়ে কেরোসিন ঢালার মত বলিউডি চিজ আমি নই। 
- প্রেম নয়। অথচ হৃদয়ে চোট বিপিনদা?
- প্লাস টু ফাইনালটা দে। কলেজের ফার্স্ট ইয়ার কী জিনিষ সে'টা মালুম কর। দু'দিন ক্যান্টিনের ঠাণ্ডা চাউমিন খা। তখন বুঝবি হৃদয়ে কত শয়ে শয়ে লেয়ার রয়েছে। 
- লেয়ার?
- স্তর। গভীর, অগভীর। এই প্রেম ট্রেম খুব নিচু লেভেলের ইমোশন। হৃদয়কে সামান্য বাজালে দেখবি প্রেমের ছপরছপর বড়জোর  পুরীর হলিডে হোমের ব্যালকনি। অন দি আদার হ্যান্ড, সমাজের জন্য যে ভাবনাগুলো, দেশের জন্য যে চিন্তাগুলো, দশের জন্য যে আবেগগুলো; সেগুলো রয়েছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের পেটের তলানিতে। 
- ও। বটে। 
- বেশি মাথা ঘামাস না রে। বছর খানেক যেতে দে। গালের দাড়ি সামান্য শক্ত হোক। তখন এসবের মানে বোঝার চেষ্টা করিস। 
- আচ্ছা, তোমার মধ্যে কি দেশের দশের চিন্তা নিয়ে ব্যথা তৈরি হয়েছে বিপিনদা? সে জন্যেই বুঝি তোমার খেলতে যেতে ইচ্ছে করছে না?
- পেরেকের মাথায় যে হাতুড়িটা মারতে পেরেছিস, তার জন্য তোর বাহবা প্রাপ্য। কাল মনে করাস, তোকে খাস্তা কচুরি খাওয়াবো'খন। 
- সমাজচিন্তাটা ঠিক কী'রকম বিপিনদা?
- বুল্টিকে নিয়ে। 
- বুল্টি? নিলুর দিদি? 
- হুঁ। মেয়েটা মন্দ নয়। তবে সমাজের অবক্ষয়ের থেকে কদ্দিন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে সে'টা বলা যাচ্ছে না। আর পাড়ার সিনিয়র হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব তো থাকেই। আফটার অল এই অবক্ষয়ের ঢেউ...। 
- হ্যাঁ। পাড়ার সিনিয়র হিসেবে অবিশ্যি সব ছেলেমেয়েই তোমার খুব ইয়ে করে। চাঁদা তুলতে, দধিকর্মা মাখতে, মড়া পোড়াতে; সর্বত্র তোমার স্কিল কিন্তু সর্বজনবিদিত। আমাদের নেতাজী সঙ্ঘের ফুটবল টিম তো ডিফেন্সে তুমি না থাকলে হাফ কানা। এই তো সেদিন বাবা বলছিলে, চ্যাটার্জী বাড়ির বিপিন ছোকরা ডেঁপো হতে পারে কিন্তু তার মধ্যে কত ক্ষমতা। নেহাত পড়াশোনায় অশ্বডিম্ব...। 
- থাম থাম। ভার্বাটিম কোট না করলেও চলবে। 
- তবু। তোমায় দাদা বলে পাড়ার ছোটরা কত ভক্তি শ্রদ্ধা করে। বুল্টিদিও তো তোমার ছোট...সে'ও তোমার আপন দাদার মত করে...। 
- বড় বেশি কথা বলিস পলু। যা ভাগ। তোর খাস্তা কচুরি বাদ গেল। 
- আহ! ব্যথাটা কী বলবে তো?
- এই যে সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের ঢেউ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আছড়ে পড়ে আমাদের শশব্যস্ত করে তুলেছে তার থেকে মুক্তি কোথায়? এই যে আধুনিক বেলেল্লাপনা আমাদের অন্তরের পবিত্রতার কলসকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করে চলেছে, তার খেসারত কে দেবে? 
- অবক্ষয়ের ঢেউ? কলুষিত? বুল্টিদির কিছু হয়েছে নাকি?
- হয়নি। তবে হতে চলেছে। 
- কী?
- সর্বনাশ। 
- সে কী!
- ক্যালামিটি। নিশ্চিত। 
- কেন?
- কী আর বলব রে। ও পাড়ার শশধর। 
- শশী কপুরের মত যে দেখতে?
- থাম থাম । শশী কপুর। কে বলে সে শশী কপুরের মত দেখতে? এবার বলবি নিউ বালক সঙ্ঘ ব্রেজিলকে ছয় গোল দেবে। 
- শশধর কী করেছে? 
- এই দেখ। 
- চিঠি?
- ফ্রম শশধর। টু বুল্টি। 
- আইব্বাস! সুগন্ধি গোলাপি খাম গো বিপিনদা। 
- আদেখলামোর বাহার দেখ। তাই বলি। দেশের জন্য। দশের জন্য। বুল্টির জন্য। বড় চিন্তা। একজন রেস্পন্সিবল সিটিজেন হিসেবে এর একটা বিহিত করা আমার দায়িত্ব। 
- বিহিত? সমস্যাটা কী?
- মানে? এ পাড়ার মেয়ে কে বেলতলার ছেলে চিঠি দিচ্ছে। তুই জানিস বেলতলার পার ক্যাপিটা গাঁজা কন্সাম্পশন হুগলী ডিসট্রিক্টে হাইয়েস্ট? 
- এটা আবার কোথা থেকে জানলে?
- কমিক্সের বাইরে বেড়িয়ে একটু জগৎটাকে চেখে দেখ বাবা। আজ ও পাড়ার ছেলে বুল্টিকে চিঠি দিচ্ছে। আগামীকাল সেখানকার কোন গাঁজাখোর তোর বোনকে চিঠি দেবে। ভাগিয়ে বিয়ে করবে। সামলাতে পারবি?
- বলো কী! 
- শোন। দেশের কাজ দশের কাজে পিছিয়ে থাকলে তোর পার্সোনালিটি তৈরি হবে ভেবেছিস?
- না মানে কাজ যে ঠিক কী করব...।
- কাজ আমি দেব। তোর বাবা তো বুল্টির বাবার গলায় গলায় দোস্ত। এ চিঠি নিয়ে গিয়ে সোজা কাকুর হাতে তুলে দে। শশধরের হাঁড়ি হাটে চৌচির হয়ে পড়ে থাকুক। বুল্টির বাবা চাবকে সিধে করে দেবেন ব্যাটাচ্ছেলেকে। 
- ডাইরেক্ট দেব? 
- নয়তো কি পোস্ট করবি?
- মানে, বলব যে তুমি দিয়েছ এ চিঠি আমায়?
- ওরে আমার মাকাল ফল রে! হুইস্‌ল ব্লোয়ারদের কত গোপনে কাজ হাসিল করতে হয় জানিস? বুল্টিকে যে আমিই বাঁচিয়েছি শশধরের কুনজর থেকে, সে খবর যদি রাষ্ট্র হয়; তাহলে কি অন্য শশধররা আমার থেকে সাবধান হয়ে যাবে না? আমাদের পাড়ার আর চারটে বুল্টির সর্বনাশ কি সেই ক্ষেত্রে আমি রুখতে পারব?  সমাজসেবা ঢোল পিটিয়ে হয় না রে পলু। ব্যাটম্যানকেই দেখ। 
- ও। আচ্ছা। বেশ দিয়ে দেব। আচ্ছা বিপিনদা, এ চিঠি তোমার হাতে এলো কী করে?
- অত খবরে তোর কাজ কী? যা বললাম হয়ে যায় যেন। 
- ঠিক হ্যায়। বিপিনদা, ইয়ে ওই কচুরি ব্যাপারটা...। 
- আরে হবে হবে। সঙ্গে মোহনভোগও থাকবে। 

**

- তুমিই শশধর?
- হ্যাঁ। কিন্তু তোমায় তো ঠিক...। 
- গত ম্যাচের ওই ফ্রিকিকটা ক্রসবারে লাগল...। 
- ওহ। বিপিনদা। জব্বর শট তোমার পায়ে।
- তা কাল তোমাদের ক্লাবে গেছিলাম। আড্ডা দিতে। তোমায় দেখলাম না তো।
- জরুরী একটা কাজে বাইরে ছিলাম। 
- জরুরী কাজ? সাঁপুইদের মেলায় ফুচকা খাচ্ছিলে বুঝি? 
- ও। হ্যাঁ, মানে। ইয়ে। আপনি দেখেছিলেন বুঝি?
- সোশ্যালিস্ট তো, সোসাইটির খবর ছাড়া আমার চলে না। ফুচকা যে একা খাচ্ছিলে না, সে খবরও আছে ভাইটি।
- আচ্ছা। না মানে। আমি আসি বরং। 
- বলছি বুল্টির ব্যাপারটা নিয়ে তুমি কিন্তু কোন চাপ নিও না। 
- বু... বুল্টি?
- ওই দেখ। আমার কাছে লজ্জা কীসের? কত ক্রস-পাড়া প্রেম আমার সুপারভিসনে বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এটা তো আমার এক্সপার্টাইজ। আর প্রেমের সাবজেক্টে দেশের ও দশের উপকার না করলে আবার আমার গলা বুক জ্বালা করে। ডাইজিনেও লাভ হয় না। 
- ওহ। আচ্ছা। মানে আমি শুরুতে একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। 
- বোঝ। কী মুশকিল। পাড়ার দাদারা যদি একটু হেল্প না করে, তবে কারা করবে?
- না মানে, তুমি অন্য পাড়ার কী না। তাই সামান্য চিন্তা হচ্ছিল...বুঝতেই পারছ, বুল্টিদের বাড়িতে যা কড়া শাসন...। 
- আরে ধুস। অন্য পাড়া আবার কী? কাউন্সিলর তো এক। আর বুল্টিদের বাড়িতে আমার রীতিমত হোল্ড আছে। বুল্টির ছোটভাই নিলুকে তো আমিই ফিজিক্স পড়াই। সময়মত রেকমেন্ড করে দেব। কাকু আমার কথা ফেলেন না কখনও।
- বাহ! শুনে বুকে বল পেলাম। 
- তোমার বুকে আপাতত দেখছি একটা গোলাপি খামের চিঠি। খামটা সুগন্ধি কি? সুবাসটা ছড়িয়েছে। 
- হেহ। হ্যাঁ মানে...ওই আর কী।
- বুল্টির জন্য লিখেছ?
- হ্যাঁ। ইয়ে। মানে। তুমি যেন আবার কাউকে...।
- ধুর বোকা। আমায় লজ্জা কীসের? 
- না। মানে। আমাদের দেখা তো সহজে হয় না। বুল্টির বাড়ির যা কড়া শাসন। শুক্রবার করে নিমাইবাবুর টিউশনে খালি একবারের জন্য...। এই চিঠি টিঠি তখনই...। 
- আজ তো সোমবার সবে। এত খেটে চিঠি লিখলে, এখন বসে থাকবে কবে শুক্কুরবার হবে আর তবে বুল্টিকে এই চিঠি দেবে? 
- না মানে...উপায় কী বলো।
- উপায়? আমি কি ঘাস কাটতে রয়েছি? এ চিঠি আমায় দাও। পৌঁছে যাবে জায়গা মত। 
- না না। তুমি আবার এত ঝামেলা কেন...?
- নাহ। কোন ঝামেলা নয়। শোন। আর দেরী নয়। তুরন্ত চিঠিটা দাও দেখি। আর খামের এই মিঠে গন্ধ ভেবেছ শুক্রবার পর্যন্ত থাকবে? দাও দাও।
- দেব?
- আলবাত দেবে। আজ থেকে আমিই তোমার পোস্টম্যান। কেমন? 

**

- বিপিনদা!
- হুঁ।
- কী রে, বিয়েতে এলি না?
- না মানে। ওই। একটা চাকরীর পরীক্ষা ছিল রে।
- ধুস। শশধর তোর খোঁজ করছিল কত। তোর সাথে নাকি অনেক বছর আগে ওর একবার দেখা হয়েছিল। 
- ওহ। হ্যাঁ। ফুটবল খেলতে গিয়ে। বড় ভালো ছেলে। অবিকল শশী কপুরের মত দেখতে। 
- ধ্যাত। আমি কত ভাবলাম তুই আসবি। পলুকে কত করে বললাম তোকে ধরে আনতে। 
- বললাম তো। পটনা গেছিলাম। পরীক্ষা দিতে। আজই ভোরে এলাম। 
- বিপিনদা, তুই আমার শ্বশুরবাড়িতে আসবি? খুব যত্ন করব কিন্তু। নিজের হাতে মাংস রেঁধে খাওয়াব। তুই ভাইকে ফিজিক্স পড়াতিস। আমায় আঁকা শিখিয়েছিস কতদিন। কলেজ পলিটিক্সে হনু হয়েই আমাদের ভুলে গেলি। আমার বিয়েতেও ডুব দিয়ে দিলি। মা কিন্তু খুব রাগ করেছে। 
- ওই আর কী। 
- আসবি?
- কোথায়?
- আমার শ্বশুরবাড়িতে?

**
বুল্টি সেদিন ঝুপ  করে প্রণাম করেছিল। বিপিন আটকানোর সুযোগ পায়নি। চড়া দাগের বামপন্থী বিপিন সেই একবারই অকালে নিজের পৈতে ত্যাগ করার জন্য হাত কামড়াতে চেয়েছিল। ব্রহ্মতেজ পকেটে থাকলে বড় ভালো হত, তেমনটাই মনে হয়েছিল বিপিনের। 

প্রাণপণে সে'দিন "ভালো থাকিস, আশীর্বাদ করলাম; চিরকাল আনন্দে থাকিস বুল্টি" আউড়ে চলেছিল সে। অবশ্য মুখ দিয়ে খসখস করে বেরিয়ে এসেছিলে " আহ, আবার এ'সব কেন রে"। 

সেই প্রথম বুল্টিকে ছোঁয়া। স্নেহ সম্বলিত হাত মাথায় নেমে আসার মত দৃপ্ত ভালোবাসা-স্পর্শ বোধ হয় আর দু'টি নেই।   

3 comments:

Ari Charaborty said...

trajic korar ki dorkar chilo dada....bipin da rao toh kella fote kore....!!!

Ari Charaborty said...

trajic korar ki dorkar chilo dada....bipin da rao toh kella fote kore....!!!

Anonymous said...

Kub bhalo