Saturday, December 21, 2013

স্যান্টার সারপ্রাইজ




মন বিলকুল  ভালো নেই। ডিসেম্বর এসে গেল তবু ধোপার ব্যাটা পশমের ওভার কোট আর প্যান্টালুন ফেরত দিলে না। লাগসই টুপিখানা সেই যে গত ফেব্রুয়ারি থেকে হাওয়া, এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না । নতুন এক খানা টুপি জোগাড় করে নেওয়া যায় বটে, তবে পুরনোটার মায়া ত্যাগ করা কি অতই মামুলি ? ওদিকে স্লেজ খানার মধ্যে রাজ্যের উচ্চিংড়ের বাস। সাফ করতে জান কয়লা হয়ে যাবে। রেইন-ডিয়ার গুলো রাম আলসে হয়ে উঠছে, দিনরাত শুধু গাণ্ডেপিণ্ডে গিলবে আর মেদ বাগাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ অন্য জায়গায়। গিন্নী বেজায় জেদ ধরেছেন ডায়েট করে রোগা হতে হবে। এমন তাবড় ভুঁড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ালে নাকি গিন্নীর ইজ্জত ফ্র্যাকচার হয়ে যায়। গত দু'মাস যাবত খাওয়া-দাওয়ায় জোর করে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাটাচ্ছেলে ভুঁড়িও গিন্নীর সাথে তাল মিলিয়ে ইঞ্চি চারেক কমে গেছে ইতিমধ্যেই ।  লাও ঠ্যালা। রস ছাড়া যেমন রসগোল্লা হয় না, তেমনি ভুঁড়ি ছাড়া কি স্যন্টা ক্লজ্‌ হয় ? চিমসে চেহারার কাউকে দুনিয়ার কোন বাচ্চা কি স্যান্টা ক্লজ্‌ বলে কদর করবে ?
এই সব সাত পাঁচ ভেবে ভেবে স্যান্টার রাতের ঘুম হাওয়া। গতবারে ইকুয়েডোরের এক খুকির উপহার শ্যামনগরের এক মিচকে খোকার উপহারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার পর থেকেই মনটা খচ্‌খচ্‌ করছিল। ঠিক গড়বড় হল এইবার। আর হপ্তা খানেকের মধ্যে উপহারের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পরার কথা, অথচ এদিকে না আছে ধড়াচুড়ো, না বাহন তৈয়ার। অন্য দিকে ভুঁড়ি বাবাজি বেজায় চুপসে রয়েছে। কোটপ্যান্ট পড়ে ফিটফাট বাবুটি সেজে যদি ট্রামে, বাসে করে মর্তলোকে ঘুরতে হয়ে তবে ইজ্জতের কোপ্তা হতে বাধ্য।

বিছানায় শুয়ে এমন সব বিদঘুটে সব চিন্তা করতে করতে সবে স্যান্টার চোখে একটু তন্দ্রা এসেছে- এমন সময় এক মিষ্টি কণ্ঠস্বরে স্যান্টার তন্দ্রা ভাঙল:
-   “ স্যান্টা, ও স্যান্টা, ঘুমিয়ে পড়লে ?”
স্যান্টা দেখলেন বছর ছয়েকের একটি ফুটফুটে মেয়ে। মিষ্টি সাদা ফ্রক পোশাকে। তার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সম্ভবত জাপানী।
-   “ তুমি কে মামনি?” , স্যান্টা ব্যস্ত হয়ে পড়লে, “ এখানে এলে কি করে ?”
-   “ বাঃ রে, তুমি যখন আমার বাড়িতে আচমকা মাঝরাতে বাবা মা কে না জানিয়ে আমার কাছে এসেছিলে উপহার নিয়ে, আমি বুঝি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তুমি কি ভাবে এলে ?”
-   “ লে হালুয়া”, স্যান্টা অবাক, “ তাই তো, তোমার নাম কি মা ?”
-   “ কিম, মনে পড়ে?”
-   “ মনে ? ইয়ে মানে, পড়ে বই কি”
-   “ কচু মনে পড়ে। ছোটরা ভগবানের মত হয় না? তাঁদের মিথ্যে বলতে নেই”
-   “ সরি মামনি। বয়স হচ্ছে তো। ভুলে যাই মাঝে মাঝে”
-   “ ওটা নদী থেকে অল্প দূরে আমাদের বাড়ি ছিল। লাল রঙের। মনে পড়ে ? “
-   “ ওটা নদী ? হি...হি...হিরোশিমায় ? লাল বাড়ি? উঠোনে সাদা রঙের দোলনা ? বাড়ির সামনে ছোট্ট একটু বাগান ? উফ, তুমিই সেই কিম যে বায়না করেছিলে যে সাইকেল না পেলে তুমি নতুন বছরে কোত্থাও না বেরিয়ে বাড়িতে গুম হয়ে বস থাকবে ? হেঃ হেঃ, তোমার বাবার মাথায় সাইকেল কিনে দেওয়ার বুদ্ধিটা আমি কেমন চমৎকার ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম বল। দারুণ সারপ্রাইজ ছিল না কিম ?”
-   “ বাহ, এই তো তোমার সমস্ত মনে আছে”
-   “ মাত্তর সত্তর বছর আগেকার কথা, স্যান্টার কি ভুলতে আছে?”
-   “ থ্যাঙ্ক ইউ স্যান্টা, তার পরের বছর আর আমাদের হিরোশিমায় এলে না কেন স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর, মানে পরের বছর ঠিক, পরের বছর...”
-   “ পরের বছর কি স্যান্টা ?”
-   “ পরের বছর ক্রিসমাসে তো তুমি ছিলেনা খুকি”
-   “জানি, অগস্টে বোমা পড়েছিল। আমাদের বাড়ির বেশ কাছেই। আমরা অবশ্য টের পাওয়ার আগেই ঝলসে গেছিলাম। কষ্ট পাওয়ার আগেই আমি বাবা, মা ও আমার ছোট্ট ভাই ছাই হয়ে গেছিলাম জান? আর শুধু কি আমরা, সত্তর হাজার মানুষ সেই রাত্রেই... ও কি, তুমি কাঁদছ?”
-   “তুমি সে বছর আমার কাছে একটা কলের পুতুলের জন্যে বায়না করেছিলে কিম। কিন্তু যে মানুষের কাছে বন্দুক-বোমা থাকে; তাঁরা যে আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কিম। আমি পেরে উঠিনি ওদের সাথে। তোমার জন্যে কলের পুতুল আমি আনতে পারিনি মামনি। পারিনি”
-   “তুমি কি করবে বল স্যান্টা ? তুমি তো আমাদের কথা শুনতেই। কিন্তু তার আগেই তো...কিন্তু স্যান্টা একটা কথা বল, আরও যারা রয়ে গেছিল, তাঁদের জন্যে অন্তত তুমি সে বছর হিরোশিমাতে গেলে না কেন ?”
-   “ সাহসে কুলোয় নি। অত রক্ত, অত যন্ত্রণা। কার জন্যে উপহার নিয়ে যাব মামনি ? কেউ তো স্যান্টার কাছে আবদার করার মত অবস্থাতেই ছিলনা”
-   “ কেউ কিছু না চাইলে বুঝি যেতে নেই ? আচ্ছা স্যান্টা , যারা আমাদের বাড়ির ওপর বোমা ফেলেছিল, সে বছর তুমি তাঁদের বাড়িতে গেছিলে ?”

স্যান্টা’র দম বন্ধ আসছে মনে হচ্ছে। কিম তাঁকে আদর করে জড়িয়ে ধরছে কিন্তু স্যান্টা শান্ত থাকতে পারলেন না। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। সে কি হাউ হাউ বুক ফাটা কান্না। সম্বিত ফিরল গিন্নীর ঝাঁকুনি তে।
_ “ অমন ফেউ ফেউ করে কান্না কেন মিনসে ?”
স্যান্টা ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলেন মাঝরাত। কিম কি তবে স্বপ্নে এলে ? সত্যি নয় কি ? আচমকা স্যান্টা অবাক হয়ে দেখলেন তার নাদুস নুদুস ভুঁড়িটি আবার ফুলে ফেঁপে আগের মত হয়ে গেছে। স্যান্টা বুঝলেন যে কিম সোনা তাঁকে তার ভুঁড়িটি উপহার দিয়ে গেছে। মনে প্রাণে চাইলে সবার জন্যেই স্যান্টার উপহার অজান্তেই এসে হাজির হয়। বাপেরও যেমন বাপ আছে, স্যান্টারও স্যান্টা রয়েছে।
“ মেরি ক্রিসমাস”, হাঁক ঝালাতে ঝালাতে সেই মাঝরাত্তিরেই স্যান্টা ছুটলেন স্লেজ সাফ করতে। 




6 comments:

suman das said...

asomvob valo laglo...

suman das said...

asomvob valo laglo...

malabika said...

প্লটটা দারুণ।

DEB said...

Osadharon....

Unknown said...

Khub shundor :)

Dipta Chaudhuri said...

বাহ্ :-)